সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

প্রকল্পের নাম রবীন্দ্রনাথ

মহীরুহের কাছে যেতে নেই, তাকে নাকি দূর থেকে দেখতে হয় । কিন্তু কাছে না গেলে কি তার ব্যপ্তি অনুভব করা সম্ভব ? রবি ঠাকুর আমদের কাছে সেই মহীরুহের মত । আমরা যে যার মত করে তাঁর কাছে যাই, তাঁর সান্নিধ্যে থাকি । তিনি ধূমকেতু নন । তিনি ধ্রুবতারার মত । অনন্ত বিরাজমান । তাঁর বিচরণ সর্বত্র । শিল্পের সমস্ত শাখায় তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। বাংলা ভাষার এক অন্যতম ধারক ও বাহক । বিশ্বের দরবারে বাংলার উজ্জ্বল স্থান প্রতিষ্ঠার কারিগর রবীন্দ্রনাথ । 
প্রতিভার গুণে তিনি যুগের পর যুগ পৃথিবীর কাছে অমর হয়ে আছেন, মনের গোপন কুঠুরিতে সর্বদা বিরাজমান । এই প্রতিভা কি তিনি সাবলীল ভাবেই পেয়েছিলেন না কি রপ্ত করেছিলেন ? 
সকলে রবীন্দ্রনাথ হন না তেমনই রবীন্দ্রনাথও সকল নন । নিজের সৃষ্টির প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা অন্তরের গভীরতম কক্ষ থেকে আসে । কিন্তু সকলে সেই ভালোবাসাকে আগলে রেখে চলতে পারে না । সেই ভালোবাসার কাছে নতজানু হয়ে বসতে পারে না । পারে না সৃষ্টির সাবলিলতার আনন্দে এতটাই মাতোয়ারা হয়ে পড়তে যে কোনও বিষাদই তাঁকে স্তিমিত করতে পারবে না । রবীন্দ্রনাথ পেরেছিলেন । পেরেছিলেন বলেই জীবনের সমস্ত বিষাদের কাছে তিনি হার মানেননি । যাবতীয় যন্ত্রণাকে তিনি বারবার কাগজ-কলমের নৈপুণ্যতায় সুন্দর রূপ দিয়েছিলেন । প্রথমেই পারেননি । তা ছিল এক দীর্ঘ প্রস্তুতি । কবি সেই প্রস্তুতি বহুবছর আগে থেকেই নিয়েছিলেন । 
আমরা আজ জানি রবীন্দ্রনাথ একটি প্রাকৃতিক দৃশ্যকল্প । জলোচ্ছ্বাস, অগ্ন্যুৎপাত, মেঘগর্জন ইত্যাদির মতই রবীন্দ্রনাথ একটি ন্যাচারাল ফেনোমেনন । যেদিন তিনি বজরা ভাসিয়ে খাজনা আদায়ে বের হয়ে গিয়েছিলেন সেদিনই তিনি একা হয়ে পড়েছিলেন । বলা ভালো একা হতে চেয়েছিলেন । একা হওয়াটা শিল্পীর জন্য একান্ত প্রয়োজনীয় । আন্দ্রে জিদ বলেছিলেন শিল্পী হতে গেলে আগে বাড়ি থেকে পালাও । পাশের বাড়ির শাশুড়ি বউয়ের ঝগড়া, বাড়ির টিভিতে প্যানপ্যানে সিরিয়াল এসবের মধ্যে একা হওয়া যায় না । নিজের শ্রেষ্ঠ লাইনটা লেখার আগেই হয়তো দরজা খুলে অনাগত অতিথি এসে বলল, “কী লেখো এইসব ফেসবুক টেসবুকে কিছুই বুঝি না ।” সেই লাইনটা আর লেখা হল না । অধরা থেকে গেল । কবি এই সময়ের আন্দাজ আগেই করেছিলেন । 
আমার ও আমার শিল্পের মধ্যে যেন কেউ না থাকে... তাই তিনি যখন তখন চাইলেই একা হয়ে যেতে পারতেন । কলমের ছোঁয়ায় বেরিয়ে আসত একের পর এক মাস্টারপিস । সেই যে বজরা নিয়ে বাংলার নদীতে ভেসে পড়েছিলেন সেটাই ছিল তার একা হওয়ার প্রস্তুতি । নিজের হৃদয়ে ভাবনাকে ভাবিত করার জন্য এক চালনাশক্তির প্রয়োজন । তাকে প্রয়োগ করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রকৌশল বিদ্যার জন্যই তো এত আয়োজন । নিবিড়তম স্থানেও নিজের পাশে নিজেকে পাওয়ার কৌশল । একা হয়েও একাকিত্ব অনুভব না করার আঙ্গিক । ক্রমাগত সৃষ্টির প্রতি মনোনিবেশ করতে পারার সাধনচাতুর্য । আমরা অফিস ফেরত ক্লান্তি, ট্রাম বাসের ক্যাকোফনি, প্রেম ভালোবাসা সম্পর্ক ইত্যাদির মায়াজালে এতটাই আবদ্ধ হয়ে পড়ি যে নিজের সৃষ্টির সঙ্গে একলা হতে পারি না, সৃষ্টিকে লাভক্ষতির অঙ্কে না ফেলে থাকতে পারি না। সুনামের আকাঙ্খায় সৃষ্টির সঙ্গে ছল চাতুরি করতেও দ্বিধা করি না । রবীন্দ্রনাথ হয়তো এসব ভাবেননি । শিল্পই ছিল তাঁর ঈশ্বর । শিল্প তাঁর অন্তর আত্মা...প্রাণের আরাম । 
নিজের সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কের নেশায় মাততে হয়। যে নেশা আমাকে যাবতীয় জাগতিক দৃষ্টিনন্দন থেকে দূরে রাখবে । আবার চারপাশের সঙ্গে এতটাই নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তুলবে যে সামান্যতম ঘটনাও আমায় ভাবিত করে তুলবে । নিজেকে মহীরুহতে পরিণত করতে পারার প্রথম এবং সর্বোত্তম শর্তই হল অনুভব করা । রবীন্দ্রনাথও নিজেকে এই অনুভুতির পাথেয় পথ দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন । যেতে যেতেই তিনি বুঝেছেন তাঁর অনুভব করার ক্ষমতা আর পাঁচজনের থেকে বেশি । তিনি বুঝতে পেরেছেন তাঁর মধ্যে এই প্রদত্ত ক্ষমতার শনশন ঝাপটা আছড়ে পড়ে সামান্যতম ঘটনার প্রেক্ষিতেও । মানুষের নিরাশা, দেশে ব্রিটিশের অত্যাচার যেমন তাঁকে নাড়া দিতে থাকে তেমনই আবার গাছ থেকে পাতা ঝড়ে পড়লেও তিনিও ভাবিত হন । পতঙ্গের মৃত্যু তাঁকে ভাবিয়ে তোলে । মজে যাওয়া নদীর চিহ্ন দেখেও তিনি হতাশ হন । রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকেই তাঁর ইন্সপিরেশন হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন । বারবার তিনি প্রকৃতির কাছে ফিরে গিয়েছেন । তাকে আবদ্ধ করেছেন নিজের বাহুডোরে । কান্না পেলে প্রকৃতির হাওয়ার মিলিয়ে দিয়েছেন তাঁর শব্দ । বজরা ভাসিয়ে যখন তিনি জলে নেমে গেলেন তখন তাঁর ব্যপ্তি পূর্ণতা পেল । এই ব্যপ্তি নিয়েই তিনি জন্মেছিলেন । যা বৃহৎ, যা সুন্দর । অনায়াসেই তিনি পূবের আকাশের সঙ্গে পশ্চিমের আকাশের পার্থক্য ধরে ফেলতে পারলেন । নিজের সৃষ্টির জন্য প্রকৃতির কোলে ফিরে গেলেন বারবার । শান্তিনিকেতন তৈরি করলেন । রুক্ষ জমিকে তিনি মরূদ্যানে পরিণত করলেন । যে বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে তিনি একের পর এক কবিতে লিখে গেলেন । আজ এই মুহুর্তে নির্দ্বিধায় বলা যায় সেই বৃক্ষের ছায়ার থেকেও তার উদারতা , তার বিশাল ব্যপ্তি, নির্বিকার ভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার প্রণয় কবিকে বেশি আকর্ষিত করেছিল ।  কাগজ কলম হাতে নিয়ে যে শিশুর মত সৃষ্টির প্রতি অপার দৃষ্টিতে চেয়ে থাকতে হয়, ভাবনাদের তরান্বিত করতে হয়, চিন্তাকে সুদুরপ্রয়াসী করতে হয়, তা একদিনে একমনে আসে না । নিরন্তর তার সঙ্গে যুঝতে হয় । রুটিন করে তার সঙ্গে ঘর করতে হয় দীর্ঘবছর । কবির এই অভ্যেস দীর্ঘমেয়াদি । নিজেকে মহীরুহতে পরিণত করার অনেক আগে থেকেই তিনি বীজ বপন করেছিলেন । আদরে-যত্নে এবং সংযমের সঙ্গে তিনি তাকে ধীরে ধীরে বড় করেছেন । বারবার ফিরে গেছেন । নতজানু হয়েছেন । বিষাদের বিষছায়ায় নিজেকে পুড়ে যেতে দেননি । আগুনের থেকে দু’হাত তফাতে দাঁড়িয়ে আগুনের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছেন  পুড়িয়ে ফেলার চেতনাকে । সন্তানকে দাহ করে ফিরে এসেছেন ঘরে । তারপর ঘিরে ফেলেছেন নিজেকে । ফিরে গেছেন কাগজ কলমের কাছে । আকাশ যেমন সবসময় নির্বিকার থাকে তেমনই নির্বিকার চিত্তে রচনা করে গিয়েছেন একের পর এক কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ, উপন্যাস...তাদের থেকেই জন্ম হচ্ছে নতুন পৃথিবী । সেই সৃষ্টি অমর... 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...