সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন-
“গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের।
বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের।
পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে।
গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”।

আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্যে দিয়েই আসেনি। রেলগাড়ি এসেছে ‘পথের পাঁচালি’র পরবর্তী পর্ব ‘অপরাজিত’ ও ‘অপুর সংসার’এও। রেলগাড়ি যে গূঢ় অর্থ বহন করে এনেছিল আমরা তা খতিয়ে দেখলাম না কখনো। জীবিকার টানে, সুস্থ সুন্দর জীবনের টানে গ্রাম থেকে শহরে আসার হিরিক লেগেছিল। রেলগাড়ি সেই সত্য বহন করে এক ষ্টেশন থেকে অন্য ষ্টেশনে চলে যাচ্ছিল শুধু। 
দেশের সমস্ত শহরের পরিযায়ী শ্রমিকদের হিসেব যদি করা হয় তাহলে তার সংখ্যা একশো মিলিয়ন ছাড়াবে। ভারতবর্ষের ওয়ার্কফোর্সের প্রায় ৮০ শতাংশ। যাদের নিয়ে কারোর টালবাহানা ছিলনা কোনদিনও । উঁচু উঁচু ইমারত তৈরি, ঝাঁ চকচকে রাস্তা বানানো, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, সারা দেশ জুড়ে নিত্য প্রয়োজনীয় মালের সরবরাহ ইত্যাদি আরও নানান কাজের জন্য প্রয়োজন হয় সস্তার শ্রমিকের। যাদের নুন্যতম ডেইলি ওয়েজ নেই, স্বাস্থ্য সুরক্ষা নেই, পিএফ নেই, মেডিকেল নেই, এইচআরএ নেই, ছুটি নেই, পেনশন নেই কিচ্ছু নেই। আছে বলতে শুধু দুবেলা পেট চালানোর মত রোজকার। তাও সারা বছরের জন্য নয়। এহেন মানুষদের জন্য ভাবার সময় কারোর নেই। কারন দেশের ৫৯% সম্পত্তির মালিকানা আছে মাত্র ১% মানুষের কাছে। আর আমরা যারা পরিযায়ীও নই এবং উচ্চবৃত্তও নই অর্থাৎ মধ্যবৃত্ত সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত তারা এখনো চুপ করে আছি। আমদের মুখের গ্রাস আমাদের সামনে চলে আসে রোজ। বাড়ির বাইরে থাকলেও আমরা নিরাপদ। আমাদের 4G আছে, ফেসবুক আছে, হোয়াটসঅ্যাপ আছে, নিত্য নতুন রান্নার রেসিপি আছে। আমরা বেশ মজায় আছি। কিন্তু ভেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করিনি মানুষ কেন রাস্তায় নেমেছে? কেন সদলবলে, গোটা পরিবার নিয়ে তারা হাজির হয়েছে বাস স্ট্যান্ডে, রেল ষ্টেশনে। এই একুশ দিনে আমরা দেখেছি কি হারে  নিম্নবৃত্ত, ভুখা, গরীব শ্রমিকের দল মাইল কে মাইল পথ পাড়ি দিয়েছে ঘরে ফেরার তাড়নায়। রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে প্রয়োজনীয় খাবারের চাহিদায়, ক্লান্তিতে মৃত্যু হয়েছে কুড়ির বেশি। দুমুঠো খেতে দিতে না পারার তাড়নায় এক মা তার পাঁচ সন্তানকে নদীর জলে ভাসিয়ে দিয়েছে। মানুষ দুমুঠো খাবারের জন্য চোখের জল ফেলছে। আস্তাকুঁড় থেকে কুকুর বেড়ালের সাথে খাবার ভাগ করে খেতে বসেছে। বারবার টিভি চ্যানেলের পর্দায়, সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় এই দৃশ্য ভেসে উঠেছে। আমরা চুপ আছি। আমরা ভাষণ শুনছি। মাস্ক পড়ছি। কেউ না পরে এলে জ্ঞান দিচ্ছি। ভিড় দেখলে তেড়ে যাচ্ছি। বারবার দায়ী করছি  ঐ হাড়হাভাতে বিচ্ছিরি মানুষ গুলোকে। 
কিন্তু আমরা এখনও জানি না  যে ওদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেলে ওরা হানা দেবে আমাদের মজুত ঘরে। আমরা যারা আগামী ছয় মাসের খাদ্য শস্য গুছিয়ে রেখেছি ওরা তেড়ে আসবে ঐগুলো ছিনিয়ে নিতে। সরকার, পুলিশ, লাঠি, বুলেট কাউকেই কোন তোয়াক্কা করবে না ওরা। ভুখা মানুষের জেদ বরাবরই বেশি। আজ বান্দ্রা ষ্টেশনে হাজার হাজার মানুষ ভিড় করেছিল শুধুমাত্র বাড়ির ফেরার এই আশা নিয়ে। কিন্তু বাড়ি ফিরতে না পারলে ওরা কী করবে সে কথা সকাল ১০টার ভাষণ ওদের বলে দেয়নি। ওদের বলে দেওয়া হয়নি ওদের বাঁচার জন্য সরকার বাহাদুর কি কী ব্যবস্থা করছে। সংখ্যাটা ১০০ মিলিয়নের বেশি। যার মধ্যে অর্ধেকের বেশি মানুষ ঘরছাড়া। তার চেয়ে আমরা বরং অপেক্ষা করি। দুনিয়া জুড়ে রিসেশন এলে আমরা কিভাবে সারভাইব করব তার এক্সেল সিট বানাই। পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশন বানিয়ে রাখি আগামীর জন্য। কোন কোন খাবার আগে থেকে মজুত করে রাখতে হবে তার হিসেব করি। কোথায় টাকা খাটালে একটু বেশি মার্জিনে লাভ হবে সেইসব নিয়ে ডিসকাস করি। কিন্তু এইসব ভাবতে ভাবতেই কখন ফ্যাতাড়ুরা আমাদের মাথার ওপর এসে ফ্যাত ফ্যাত সাঁই সাঁই করে উড়ে বেড়াবে তা আমরা বুঝতে পারব না। কারণ ওরা মাল ছিনিয়ে নিতে জানে। গ্রামাঞ্চল দিয়ে শহরাঞ্চলকে ঘিরে ফেলতে জানে। কবি পুরন্দর ভাট সেই কবেই তো বলে গেছে-
“গরীবের গাঁড় যারা মারে, 
ফ্যাতাড়ুরা হাগে তার ঘাড়ে”।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...