সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইরফান খানকে লেখা এক চিঠি

প্রিয় ইরফান,
গতকাল রাতে ঠিক এই সময়ই শুরু করেছিলাম। এমনিতেই অবসরের দিনে রাতে ঘুম আসতে চায়না। ঘুম এলেও তা বারবার ভেঙে যায়৷ ছোটবেলায় মাথার কাছে একটা ভাঙা অ্যান্টেনার রেডিও থাকত। ঘুম না এলে রাতের বেলায় আসতে করে চালিয়ে দিতাম। শুনতে শুনতে কখন যে ঘুমিয়ে যেতাম খেয়াল থাকত না। এখন হাতের পাশে মোবাইল বা বালিশের পাশে ল্যাপটপ সেই যায়গা দখল করেছে। নির্ঘুম রাত গুলোতে বা হঠাৎ করে উঠে পরা মধ্যরাতে এইগুলোই ভরসা। স্ক্রিন জুড়ে শুধুই চলমান ছবির আনাগোনা। আমরা যারা সিনামাকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলাম একসময়, কখন কীভাবে যে সিনেমাও আমাদের জীবনের রুটিনে একান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোর মধ্যে চলে এসেছে তা টেরও পাইনি। গতকাল রাতে একটা মালায়লম ছবি দেখতে শুরু করে বুঝতে পারি সাবটাইটেল নেই। এ ছবি এখন দেখা যাবে না। কিন্তু কী দেখব এটা যখন ভাবছি মাথায় এল তপন সিনহার 'এক ডক্টর কি মউত' এর কথা। অনেকদিন ধরে দেখব দেখব করে দেখিনি, ফেলে রেখেছিলাম। সেই কবে কলকাতা বিশব্বিদ্যালয়ের কড়িবরগার ক্লাসরুমে এই ছবির কথা শুনেছিলাম। ছবির টাইটেল কার্ড দেখার সময় চোখ আটকে গেলো আপনার নামের ওপর। চোখ আটকানোর কারণ ছিল কিছুদিন আগেই বরুন গ্রোভারের একটা ইন্টারভিউতে আপনার ব্যাপারে একটা কথা শুনেছিলাম যদিও জানতাম কিন্ত সেদিন শুনে কথাটা মনে গেঁথে গিয়েছিল। তপন সিনহার ছবিটা ১৯৯০ এর। আর বরুন গ্রোভার বলেছিল আপনি  ১৯৮৮  তে ডেবিউ করার পর লাইমলাইটে এসেছিলন ২০০০ এর পরবর্তী সময়ে। কিন্তু এই ছবিটায় ছোট চরিত্রে আপনি তো তুখোর অভিনয় করেছেন তবে? মনে পড়ল 'এক ডক্টর কি মউত' ক্রিটিক্যালি অ্যাক্লেমড ছবি। সবাই সে ছবি দেখেনি। সবাই যদি সে ছবি দেখত সেইসময় তাহলে ইরফান আপনাকে তারা চিনে যেত। ১৯৮৮ এর 'সালাম বম্বে'তে যে ছোট চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন শুনেছি পরে আপনার অংশটা ছবি থেকে বাদ গিয়েছিল। অনেক আগের দেখা। ছবিতে আপনার মুখটা মনে করতে পারছি না। তেমনি 'চানক্য'তে বা আপনি কেমন ছিলেন, 'চন্দ্রকান্তা'য় কেমন ছিলেন, 'জয় হনুমান' এ ঋষি বাল্মিকীর চরিত্রেই বা আপনি কেমন দেখতে ছিলেন মনে করতে পারিনা। ভিডিও দেখে আজ 'দ্যা নেমসেক'এর গোগলের বাবাকে চিনতে পারলাম। সেই কবে দেখেছিলাম। এক দশক হতে চলল। মনে ছিল না ঠিকই কিন্তু ভুলিনি। কিন্তু আপনার কথা মনে পড়লেই যে ছবিটার কথা মনে পড়ে প্রথমে সেটা হল 'হায়দর'। ইউনিভার্সিটি ফিরতি পথে বৃষ্টি বিঘ্নিত বিকেলবেলায় ঢুকে পড়েছিলাম নবীনার রিয়ার স্টলে। একা। এমনিতে একা ছবি দেখতে আমার ভালোই লাগে। তখন এই অভ্যেসটা নতুন নতুন শুরু হয়েছে। কিছুদিন আগেই স্টুডেন্টকে ত্রিকোণমিতি করতে দিয়ে ওদের লিটারেচার বই থেকে 'হ্যামলেট'টা পড়ে নিয়েছিলাম দুইদিনের ব্যবধানে। আমার এক বন্ধু বলেছিল বেস রিভার্বেশন সাউন্ড এর সাথে আউট অফ ফোকাস থেকে আপনার এগিয়ে আসার মধ্যে দিয়েই ছবিটা গতি পায়। আমি মেনে নিয়েছিলাম ওর কথা। ছোট একটা চরিত্র গোটা ছবিটার গতি পাল্টে দিল। আমরা ঠিক ভুলের ধার ঘেষলাম না। আপনার সংলাপ-
"দরইয়া ভি ম্যায়, দারাখ্ত ভি ম্যায়
ঝিলাম ভি ম্যায়, চিনার ভি ম্যায়
দায়ার ভি হুঁ, হারাম ভি হুঁ
সিঁয়া ভি হুঁ, সুন্নি ভি হুঁ
ম্যায় হু পন্ডিত, ম্যায় থা, ম্যায় হু অউর ম্যায় হি রহুঙ্গা"
শোনার পরই কাশ্মীর যে " মোস্ট ডিস্পুটেড ল্যান্ড অন দ্যা আর্থ" জেনেছিলাম। সেই থেকে কাশ্মীর নিয়ে অনবরত জেনেই চলেছি। আজ সারা সন্ধ্যে আঘা শহীদ আলীর কবিতা পড়লাম। সুর, তাল, ছন্দ, উচ্চারণ সব কিছু ভুল হচ্ছে জেনেও পড়লাম। শুধু আপনার জন্য পড়লাম ইরফান। বহু আগে দূর থেকে আপনাকে একবার দেখেছিলাম, আজ সেটাও যেন বড়ই আবছা হয়ে গেছে। দেখে বুঝেছিলাম আপনার কাছে যাওয়ার জন্য ছুটে যেতে হয়না, গলায় মালা পড়িয়ে দিতে হয়না। সাধারণ ভাবে নিজের স্বপ্ন নিয়ে বাঁচলেই আপনার কাছে যাওয়া যায়, আপনাকে ছোঁয়া যায়। ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্নে বুঁদ হয়ে যেভাবে আপনি অভিনেতা হয়ে গেলেন, যেভাবে বোম্বে পৌছে দীর্ঘ বছরের লড়াইয়ের পর মানুষের মনের মধ্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন তা বোধহয় আজও স্বপ্ন বুকের মধ্যে নিয়ে বেঁচে থাকা মানুষগুলো হাড়েহাড়ে বুঝতে পারে। অনুভব করতে পারে আপনাকে আর পারে বলেই আপনি তাদের এত কাছের একজন। পারে বলেই হয়ত এই স্মার্টফোনের যুগেও একজন কিশোর, সেজান ফার্নান্ডেজের মত এখনো চিঠি লিখে প্রেম নিবেদনের কথা ভাবতে পারে। পারে বলেই হয়ত কেউ কেউ ভোর অবধি অপেক্ষা করার পর কিছু না জানিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারে। ঠিক যেমন রেস্টুরেন্ট থেকে আপনি ফিরে এসেছিলেন। আমরাও বুঝেছি সবসময় সব যায়গায় যেতে নেই। কিছু জিনিস স্মৃতি হয়ে থাকাই ভালো। 
আমার বন্ধু জানালো বহু আগে আপনি আমার বাটানগরে এসেছিলেন। দুই সপ্তাহ ব্যাপী আমাদের স্টেডিয়াম, মফস্বলের গঙ্গার ঘাট জুড়ে শুটিং করেছেন। মিখাইল শাতরভের রুশ নাটক অবলম্বনে নির্মিত 'লাল ঘাস পর নীল ঘোড়ে'তে আপনি লেনিনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। 'কাহাকাশাঁ'তে বিখ্যাত মার্ক্সবাদী উর্দুকবি মখদুম মহিউদ্দিনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, সমরেশ বসুর কাহিনী অবলম্বনে গুলজার দ্বারা নির্মিত 'কিরদার'এ আপনি অভিনয় করেছিলেন ওম পুরী সাহেবের সাথে, অশ্বীন কুমারের 'রোড টু লাদাখ'এ আপনি অভিনয় করেছিলেন। আপনার এমন কত কাজ এখনো দেখা বাকি। কাজের মধ্যে দিয়েই তো আপনার কাছে যাওয়া ইরফান। সেই কাজ করতে করতেই হুট করে চলে যেতে হল আপনাকে? 
ক্যান্সারের যন্ত্রণা অত্যন্ত কঠিন এক যন্ত্রণা, যে সয় সেই বোঝে, কিছুটা বোঝে তার সান্নিধ্যে থাকা মানুষরা। আপনি সেই যন্ত্রণাকে দূরে সরিয়ে রেখেও ফিরে এসেছিলেন। আমাদের বার্তা দিয়েছিলেন। আমরা প্রার্থনা করছিলাম আপনার ফিরে আসার। কিন্তু আপনি ফিরলেন না। চলে গেলেন সেই দুনিয়ায় যেখান থেকে আর কখনই ফেরা যাবে না। আর কী বলব আপনাকে ইরফান! আমি জানিনা। কাল ভোর রাতে ঘুমিয়ে আজ বেলায় ঘুম ভাঙার পর যখন আপনার চলে যাওয়ার খবরটা শুনলাম এক মুহুর্তও মন লাগাতে পারলাম না কিছুতে। ভালো করে কারোর সাথে কথা বলতে পারলাম না, পড়তে পারলাম না, কিছুই পারলাম না। আপনাকে লিখতেও এতটা সময় কাটিয়ে দিলাম। লিখতে খুব ইচ্ছে করছিল তাও নয়। কিন্তু না লিখেও উপায় ছিলনা। এতটা যন্ত্রণা কীভাবে প্রকাশ করতাম ইরফান? আপনি সে কথা বলে যাননি। আপনি শুধু বলেছিলেন যখন আমাদের এই দুনিয়ায় কাজ ফুরিয়ে যায় আমরা চলে যাই। আপনার কাজ কী সত্যিই ফুরিয়ে গিয়েছিল ইরফান? ভেবে বলুন তো! উত্তর আসবে না যেমন জানি তেমনি আপনি থেকে যাবেন সেটাও জানি। আপনাকে ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে হলেই আপনার না দেখা কাজ গুলোর কাছে বা দেখে ফেলা কাজগুলোর কাছে ফিরে যাব বারবার। আপনার যে ছবিটা শেষবার সিনেমাহলে দেখতে গিয়েছিলাম সেদিনও যেমন হুট করে আপনি চলে গেলেন ছবির শেষে কিছু না বুঝতে দিয়ে আজও তাই। সেদিনও ছবির শেষে পরে ছিল কিছু শব্দরাশি পরপর বসিয়ে একটা মন কেমন করা সুর। যে সুরে আচমন করলে মনে হয় ভোরের আজানের সাথে পবিত্র হয়ে সারা পথ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা কৃষ্ণচূড়ার ওপর দিয়ে অনন্তের দিকে হেঁটে চলে যাচ্ছে কেউ। এই মুহুর্তে সেটা আপনি ছাড়া আর কেইই বা হবে। এখনও কানে বেজে চলেছে সেই সুর। আপনার জন্য আরও একবার এখানে থাকল। 
ইতি, 
যাদেরকে আপনি স্বপ্ন দেখতে শিখিয়ে গেলেন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...