কথা ছিল সন্ধ্যে ৬টার মধ্যে আমরা সবাই পৌঁছে যাব। এর বেশি দেরি করা যাবে না। কারন হাতে আর খুব বেশি সময় থাকবে না। প্ল্যাটফর্ম থেকে বেশ কিছু জিনিসও কেনার আছে। ট্রেন ছাড়ার সময় ছিল ছটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। গত প্রায় ৬ মাস ধরে চলছিল প্রস্তুতি। কোথাও একটা যেতে হবে। কিন্তু কোথায়? আমাদের দাবী ছিল মূলত তিনটি, বরফ দেখতে পাওয়া, ট্রেকিং করা ও কোন অফবিট যায়গায় শেষ দুদিন প্রকৃতির কোলে থেকে প্রকৃতিকে অনুভব করা একান্ত নিরিবিলিতে। সেইমত যায়গা পছন্দ করা চলছিল। কিন্তু তার আগেই যাওয়ার ও ফেরার ট্রেনের টিকিট কেটে নেওয়া হয়েছিল। অনেক ভেবে চিনতে, ইন্টারনেটের সাহায্য নিয়ে সকলের সম্মতিতে আমরা আমাদের ঘোরার যায়গা গুলো ঠিক করে নিয়েছিলাম। তারপর ছিল ঘুরতে যাওয়ার জন্য কিছু আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের কেনাকাটি। কিছু জিনিস কেনাও হয়ে গিয়েছিল। বাকি ছিল আরো কিছু। কিন্তু বাধ সাধল এই অতিমারি।
আমি আসতাম মালিগ্রাম থেকে। কথা ছিল হাফবেলা অফিস করে বেড়িয়ে যাব। সাড়ে তিনটের খরগপুর লোকালটা যেভাবেই হোক ধরতে হবে। ওটা ধরতে পারলে তবেই ছটায় পৌছানো যাবে। আমার রুকস্যাক নিয়ে আসার কথা ছিল সুমনের (Suman Paul)। ও আসবে বাড়ি থেকে। শুধু রুকস্যাক নয়, আমাদের সকলের রাতের খাবারও নিয়ে আসার কথা ছিল। পরটা,কষা আলুরদম আর মিষ্টি। রাজদ্বীপ(Rajdeep Paul) আর স্বর্ণা(Swarna Chakraborty) আসত নিউটাউন থেকে। ওদের অফিসের তলায় নাকি দারুন দারুন সব স্ট্রিট ফুড পাওয়া যায়। অনেকদিন ধরেই সেইসব খাবারের গল্প শুনতাম। ঠিক হয়েছিল ওরা সন্ধ্যের টিফিনের জন্য নিয়ে আসবে সাওয়ারমা বার্গার। আমার অবশ্য মন অস্থির ছিল অন্য একটা চিন্তায়। শালিনী সিংএর মালানা ক্রিমঃ শভেনিষ্ট পিগস এন্ড থার্ড ওয়েভ ফেমিনিশম ফ্লিপকার্ট, অ্যামাজনে আউট অফ স্টক হয়ে গিয়েছিল, হাওড়ার ষ্টেশনের বুক স্টল গুলোতে খুঁজতেই হবে ওখানে পাওয়া গেলেও যেতে পারে। এদিকে হাতে খুব কম সময়। কাজেই দেরি করা চলবে না। কথা ছিল ট্রেন ছাড়লেই ইন্দ্রাণীকে(Indrani) ফোন করতে হবে। শুধু তাই না গোটা জার্নির বিবরণ প্রতিদিন ডায়রির পাতায় লিখে রাখতে হবে এবং ফিরে এসে তাকে শোনাতে হবে। কিন্তু হল না, বাধ সাধল এই অতিমারি।
পরদিন অর্থাৎ আগামীকাল বিকেল পাঁচটা পাঁচে দিল্লীর আনন্দ বিহার টার্মিনাসে আমাদের ট্রেনের পৌছানোর কথা। কিন্তু ট্রেনের রিসেন্ট হিস্ট্রি বলছে ট্রেন কমপক্ষে তিন থেকে চার ঘন্টা লেট করে। কোন কোনদিন তারও বেশি। সবার কপালেই চিন্তার রেখা দাগ কাটল নতুন করে। গোলটেবিল বৈঠক বসল একদিন। মজনু কা টিলা থেকে আমাদের শেষ বাস রাত দশটা দশে। ট্রেন যদি সাড়ে আটটাতেও পৌছে যায় তাহলেও হয়ত শেষ বাস পেয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু এর বেশি লেট করলে কি হবে? দিল্লীতে সেই রাত কাটিয়ে পরদিন সকালে যাওয়ার প্ল্যান হল। কিন্তু একদিন দিল্লীতে থেকে যাওয়া মানে এক্সট্রা খরচ এবং একদিন হাত থেকে চলে যাওয়া। বিকল্প পথ ভাবা হল। দিল্লী থেকে গাড়ি করে যাওয়া হবে? কিন্তু তাতেও খরচ বেড়ে যাবে। দিল্লী থেকে ট্রেনে চণ্ডীগড় এসে ভোরের বাসে যাওয়া যেতে পারে তাতে গাড়ি করে যাওয়ার খরচ হয়ত কিছুটা কমবে কিন্তু একটা দিন সেই হাত থেকে নষ্ট হবেই। কিছুতেই মেলানো যাচ্ছিল না। একসময় আমরা হাল ছেড়ে দিলাম। সিচুয়েশন যা হবে সেই মত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাসের টিকিটও কাটা হল না, গাড়িও বুক করা হল না। শেষ হিস্ট্রি অনুযায়ী শীত শেষ হতেই ট্রেন সময়ে থাকত। একদম আমরা যেমন ভেবেছিলাম ঠিক সেইমতই। কিন্তু হল না, বাধ সাধল এই অতিমারি, দেশ জুড়ে লকডাউন।
দিল্লীর মজনু কা টিলা থেকে সেমি ভলভো বাস ধরে আমাদের প্রথম গন্তব্য হওয়ার কথা ছিল হিমাচল প্রদেশের নাজ্ঞার। মানালি যাওয়ার পথে পরে নাজ্ঞার। সুন্দর সাজানো ছোট পাহাড়ি শহর নাজ্ঞার। দেরি হয়ে গেলে নাজ্ঞারে থেকে যাওয়ার কথা ছিল পাহাড়ি রবিনহুডের হোস্টেলে। আর সময়ে পৌছে গেলে নাজ্ঞারে কিছু সময়ে কাটিয়ে রুমশু পর্যন্ত উঠে যাওয়ার কথা ছিল। সেখানেই সেইদিনের রাত্রিবাস। পরদিন থেকে আমাদের ট্রেক শুরু হওয়ার কথা। চন্দ্রখনি পাস। সাধারণত এইসময় বরফ থাকে গোটা ট্রেল ধরে। বেস ক্যাম্পে একরাত টেন্টে কাটিয়ে পরদিন ভোর হওয়ার আগেই পিকে গিয়ে সানরাইস দেখে আবার ফিরে এসে পাস পেরিয়ে মালানা গ্রামের দিকে এগিয়ে যাওয়া। মালানা বিশ্বের কাছে যে কারনে পরিচিত তা আমাদের সবার কাছে জানা। মালানা ক্রিম পৃথিবীর অন্যতম সুপিরিয়র কোয়ালিটির হ্যাস। কিন্তু এছাড়াও মালানার অন্য এক পরিচয় আছে। মালানা পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন গণতন্ত্রিক এক গ্রাম। মালানা ক্রস করে আমরা আরো তিন ঘন্টা হেঁটে নেমে আসতাম মালানা গেট অব্ধি। প্রায় ২৩ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হত গোটা দিনে। মালানা গেট থেকে গাড়ি নেওয়ার কথা ছিল। হাতে সময় থাকলে রাতে পৌছানোর কথা ছিল তোষ। আর সময় কম থাকলে রাত্রিবাসের জন্য কাশোলে থেকে যাওয়ার কথা ছিল। রাত্রিবাসের জন্য কাশোলের জিম মরিসন ক্যাফে ছিল আমাদের পছন্দ। হাতে তিনরাত সময় থাকলে একরাত তোষ, একরাত কুটলা ও একরাত কাশোলে থাকার কথা হয়েছিল। আর হাতে যদি একদিন কম থাকত তাহলে তোষ এবং কাশোলেই থাকা হত। পার্বতী নদী বয়ে গেছে এই গোটা অঞ্চলটা জুড়েই। সম্মুখে সুউচ্চ ধৌলাধার পর্বতশ্রেণী। নদীর পাশে, দিগন্ত বিস্তৃত মাউন্টেনরেঞ্জের ১৮০ ডিগ্রী ভিউকে সামনে রেখেই আমাদের হোটেলগুলো পছন্দ করা হয়েছিল। সাথে বেছে রাখা হয়েছিল ফুড জয়েন্টগুলোও। কথা ছিল ফেরার সময় কাশোল থেকে বাসে সকাল সকাল দিল্লী পৌছে গেলে লালকেল্লা, কুতুবমিনার দেখে করিমস থেকে দুপুরের খাবার খেয়ে ষ্টেশনে ফিরব। তারপর চেপে বসব অপেক্ষমান ফেরার ট্রেনে। পরদিন বেলা থাকতে থাকতেই বাড়িও পৌছে যাব। কিন্তু হল না কিছুই, বাধ সাধল অতিমারি।
হয়ত এই রুট এই প্ল্যান আর কখনো এক্সপ্লোর করা হবে না। বা হয়ত হবে কোনদিন। হয়ত এই অচলাবস্থা কেটে গিয়ে গোটা দেশ যখন আবার সচল হবে তখন আবার নতুন প্ল্যান হবে নতুন যায়গায় যাওয়ার। আবার সব কিছু শুরু থেকে করতে হবে। আবার দীর্ঘ কয়েকমাসের অপেক্ষার পর সেই কাঙ্খিত দিন আসবে। বেড়িয়ে পরার যে চেতনা আমাদের মধ্যে সর্বদা বিদ্যমান তাকে আবার জাগিয়ে তুলে হয়ত কোন দূরপাল্লার ট্রেনের জানলার সিটের সামনে বসে একের পর এক শহর গ্রামের পার হওয়া দেখতে দেখতে পৌছে যাব গন্তব্য ষ্টেশনে। তারপর কিছুদিনের জন্য নতুন জায়গা, নতুন রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ব। আবার কিছুদিন পর বেড়ানোর স্বাদ নিয়ে ঘরেও ফিরে আসব। তারপর আবার এক নতুন প্ল্যান হবে। আবার কয়েকমাসের অপেক্ষা থাকবে। এইভাবেই চলবে। হয়ত চলতেই থাকবে। তাই আপাতত এইটুকুই। এই সংক্রান্ত পরবর্তী লেখা লিখব ট্রেনের জানলার পাশে বসে। আপাতত বিদায়।
পুনশ্চঃ যেহেতু আমরা সবাই ঘরবন্দী। যেহেতু আমাদের কোথাও যাওয়া হল না। তাই কোন স্মৃতি নেই। স্মৃতিচারণ ও নেই আমাদের৷ আছে শুধু কিছু কল্পনা আর পূর্ণ না হওয়া একটা প্ল্যান। যেহেতু কিছুই এক্সপ্লোর করা হয়নি তাই কোন ছবি নেই। নিচের ছবিটা মনকে শান্তনা দেওয়ার জন্য গুগল থেকে ধার করে নিলাম। জায়গাটা কুটলা। হিমাচল প্রদেশ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।