সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম





                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,
                   এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।

                    বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান, 
                      বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।
               
      বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে খেলতে গিয়ে জোড় লেগেছিল। এতটাই লেগেছিল যে পা ফুলে ঢোল হয়ে গিয়েছিল। দু-সপ্তাহ মাঠের অভিমুখে যেতে পারিনি। দাড়িয়ে দাড়িয়ে শুধু দেখতাম খেলা। দু-সপ্তাহ পর মাঠে গিয়ে সেদিন খেলার থেকে বেশি আনন্দ পেয়েছিলাম হুল্লোড় বৃষ্টিতে ভিজে চপচপ হয়ে বাড়ি ফিরতে। ফিরে আসার পর ছিল মায়ের বকুনি। তারপর থেকে ভিজে ফিরলে পরে মা আর বকে না। শুধু বলে মাথাটা মুছে নে ভালো করে। এখন আমার ছাতা থাকে ব্যাগে তাই বৃষ্টিতে ভেজা আর হয় না।

এদিকে বৃষ্টির কথা বললেই মনে পড়ে স্কুলের সেই দিনের কথা। সকাল থেকে বৃষ্টি হোক আর ছাই না হোক, একটু মেঘ দেখেলেই সটাঙ বরুণ দেবের পায়ে। প্লিজ আজকে ১০.৩০ টা থেকে তেড়ে বৃষ্টি দাও আধ ঘণ্টা। তাহলে আজকের দিনটা বেঁচে যাই। তিনদিন ধরে ডেকেছি, দু ফোঁটা দিয়েই পালিয়ে গেছ, আজ যেতেই দেবনা। কিন্তু ধুত ছাই আজও বৃষ্টি নামল না। অগত্যা স্কুল। স্কুলের ঢোকার পরই হুরমুরিয়ে বৃষ্টি। তাই তখন আবার চাঙ্গা হয়ে উঠলাম।  এই হয়ত রেনি ডে ঘোষণা করা হবে। ইচ্ছে করে জানলা ধারে বসে বৃষ্টির ছাঁটে ভিজতাম যাতে অন্তত ভিজে যাওয়ার কারনে ছুটি পাই। কিন্তু না মনিটর ছিল মহা পাঁজি। স্যার আসলেই বলে দিত ইচ্ছে করে নাকি আমি ভিজেছি। ছুটির যায়গায় কপালে জুটত বকুনি।



ফেরার তারা থাকত সবচেয়ে বেশি কত আগে এসে খেলতে যেতে পারব। কারণ খেলে ফেরার তারাও ছিল আমার বেশি। বাড়িতে স্যার পড়াতে আসবে। আর আজকে আমার জীবন বিজ্ঞান একটুও পড়া হয়নি। গত দুদিন ধরে শুধু নতুন কেনা রেডিওতে এফ.এম এ গান শুনে গেছি। আর পড়বার সময় বইয়ের ভাজে লুকিয়ে লুকিয়ে পড়েছি “বাদশাহি আংটি”। তাই প্লিজ ঠাকুর আজকে বিকেলে খুব জোড়ে বৃষ্টি দাও, দেখো কেমন কালো মেঘও করে এসেছে।
এই তো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি থেকে জোড়ে জোড়ে পড়া শুরু হয়েছে সাথে গুরু গম্ভীর শব্দ। আজ আর থামবার পাত্র নয়। অর্থাৎ আজ বেঁচে গেলাম। কিন্তু একি মাত্র ১৫ মিনিটেই কাহিল। বৃষ্টি গেল থেমে। জীবন বিজ্ঞান খাতায় আমি লিখলাম সালোকসংশ্লেষের সময় গাছ বৃষ্টির থেকে জল নেয়। কিন্তু বৃষ্টি না হলে কি করে? ধুস হল না। অগত্যা বারান্দায় নীল ডাউন। বাইরে ঝিরঝির বৃষ্টিটা আবার শুরু হয়েছে, বারন্দা বৃষ্টির জলে ভিজছে। সবাই পর্দা টানতে ব্যস্ত, কারোর খেয়ালই নেই সেদিন আমার গাল বেয়েও বৃষ্টির থেকে বেশি জল পড়েছিল। আজ রাতে আর শোনা হল না “শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে, পড়ুক ঝরে/ তোমার ঐ সুরটি আমার মুখের পড়ে, বুকের পড়ে”। 
তারপর থেকে তিনদিন আমি খেলেতে যেতে পারিনি। তুমুল বৃষ্টি পথঘাট মাঠ ময়দান সব ভাসিয়ে দিয়েছিল। আমার ঘরে জানলাও ছিলনা যে আমি বৃষ্টি দেখব। তবে ভারি মজা হত লোডশেডিং হলে। তখন আমাদের সব ভাইবোনদের পড়া ডকে উঠত। আর তখন সবাই বড় ঘরে জড়ো হয়ে দেদার আড্ডা দিতাম। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে পাকা ছিল আমার ছোট কাকার ছেলেটি। লুকিয়ে লুকিয়ে এসে ঐ লোডশেডিং এর সময় আমাদের সকলকে ভয় পাওয়ানো ছিল ঐদিনগুলোতে ওর সবচেয়ে বড় কাজ। আর আমরাও ছাড়বার পাত্র ছিলাম না দিতাম ব্যাটার পিঠে দুমদাম করে। তবে বড় ঘরের পাশের বারান্দা দিয়ে রাস্তাটা পুরো দেখা যেত। অন্ধকারে ঐ বারান্দার রেলিং দিয়ে ভেজা রাস্তাটাকে দেখতে মন্দ লাগত না। সবচেয়ে ভালো লাগত বৃষ্টি নামলে পরে লোকজনদের হুড়োহুড়ি দেখতে। যে যেদিকে পারত ছুট দিত। ইস আমিও যদি ওদের মত দৌড়তে পারতাম তাহলে নিশ্চিত আগে যেতাম নেপালের দোকানে ওখান থেকে দু-টাকার আলুকাবলি কিনে তারপর যেতাম সুরজদের বাড়িতে। সুরজ আমার সাথে আগে খেলতে আসত। এখন আসে না। মা বলে ওর নাকি কি একটা অসুখ করেছে তাই ডাক্তারের বারণ বাড়ির বাইরে বেরনো। আমায় একদিন আলুকাবলি খেতে দেখে ও ওর মাকে বলেছিল খাবে কিন্তু ওর মা আক ধমক দিয়ে ওকে বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিল। বাবা বলে বাপ মরা ছেলে একা মা তিন তিনটে ছেলের পেট চালাতেই হিমশিম খেয়ে যায় তারপর এটা ওটা কিনে দিতে পারে নাকি। ইস ঠাকুর তুমি সুরজকে তাড়াতাড়ি ঠিক করে দাও আমি একদিন ওকে সত্যি আলুকাবলি খাওয়াবো। আমার কাছে দশ টাকা আছে মাসি দিয়ে গেছে।



সেদিনও এরমই এক বৃষ্টি ভেজা দিন ছিল। আমি তখনও আমাদের নতুন বাড়িতে আসিনি। ছোট এক কামড়ার ঘরে বৃষ্টি হলেই দেওয়াল বেয়ে চুইয়ে চুইয়ে জল পরত। বারন্দাটা ছিল আরও ভয়ানক। সেখানে ছিল মস্ত বড় একটা ফুটো। প্রতিবার সেটা সারানো হত আর প্রতিবারই সেটা বেয়ে জল পড়ত একটু বৃষ্টি হলেই। বালতি রাখা হত ওটার তলায়। কোন কোন দিন সেই বালতি ভর্তি হয়ে জল পুরো বারান্দা ভাসিয়ে দিত। খাটের ওপর থেকে আমার বসে দেখা ছাড়া আমার কোন উপায় ছিল না কারন তখনও বৃষ্টিতে বাইরে বেরনোর পারমিশন পাইনি। সেদিন রাতেও তুমুল বৃষ্টি হয়েছিল। সকাল উঠে দেখেছিলাম বারান্দাটা পুরো ভেসে গেছে। দেওয়ালে টানানো আমার নতুন আঁকা ছবিটাও পুরো ভিজে চুপচুপ। মন খারাপ হল। কিন্তু তখনও জানতাম না মন খারাপ হলে ওদের হলিডেতে পাঠিয়ে দিতে হয় যাতে ওরা আবার ঠিক হয়ে ফিরে আসতে পারে। একরাশ ভেজা মন নিয়েই স্কুলে গেলাম। বৃষ্টি শুরু হলে জানলা বন্ধ করে দিলাম। আজ জানিনা কেন বৃষ্টির জল একদম ভালো লাগছে না। দুই পিরিয়ড পর নোটিশ এল আজ এক পিরিয়ড আগেই ছুটি। সবাই আনন্দে ক্লাসে হুল্লোড় করছে। আমার যেন তাতেও কোন হেলদোল নেই। পাশে বসা সন্তু বলে উঠল আজ ছুটির পর বাড়ি যাস না খেলা হবে স্কুলের মাঠে। আমাদের স্কুলের মাঠটা তখন সবে হয়েছে পুকুর বুজিয়ে। খেলার পারমিশন মেলে না। কিন্তু আমি দেখেছি ছুটির পর আর কেউ খেয়াল রাখে না সেদিকে আশেপাশে যারা থাকে তাঁরা দিব্যি খেলতে নেমে পরে। ইস আমারও যদি ওদের মত কাছে বাড়ি হত আমিও ওদের সাথে খেলতে পারতাম। সন্তুর কথা শুনে মনে একটু আনন্দ এল। অঙ্ক পিরিয়ড শেষ হলে পর সন্তুকে গিয়ে বললাম বৃষ্টি হলে কিন্তু খেলব না। আজ আমার একটুও ভিজতে ইচ্ছে করছে না।
ছুটির আগেই হরিদা এসে আমায় ডেকে নিয়ে গেল। ব্যাগও সঙ্গে নিয়ে আসতে বলল। আমার আজ ওদের সবার আগে ছুটি। কিন্তু কেন? আমি যে আজ খেলব ওদের সাথে। হরিদা আমায় কিছু বলল না। নিচে নেমে দেখি পাশের বাড়ির বিদ্যুৎ কাকু আমায় নিতে এসেছে। আমায় চটজলদি সাইকেলে বসতে বলল। দাদুর নাকি শরীর খারাপ তাই আমায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সাইকেলে করে যেতে যেতেই তুমুল বৃষ্টি নামল। আমরা দুজনে বাড়ির কাছে পৌছে পুরো চুপচুপ হয়ে গেলাম। আজকেই বৃষ্টিটাকে নামতে হল। আজ আমার একটুও ভালো লাগছিল না ভিজতে। বাড়িতে ঢুকে বুঝলাম বৃষ্টি শুধু আমাকেই ভেজায়নি বাড়ির সকলেই আজ অশ্রু সিক্ত। একমাত্র দেখলাম একজন ভেজেনি। সে চুপচাপ শুয়ে আছে। আজ সে একবারও চেল্লিয়ে বলছে না বৃষ্টিতে জামাকাপড় গুলো সব ভিজে গেল। সেদিন বুঝেছিলাম বৃষ্টি কখনও নিয়ম মত হয় না। তার খেয়াল হলে সে হয়, না হলে হয়না। যেমন আমরা ইচ্ছে করলেও ভিজতে পারি না, আবার যেদিন ভিজে যাই সেদিন ইচ্ছে করে না।      
                                                                               ( ক্রমশ )


ছবি সৌজন্যেঃ গুগল ইমেজ।


কবিতা- রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
 

মন্তব্যসমূহ