স্টিভেন সোদারবার্গের ‘কন্টেজন্’ মুক্তি পেয়েছিল ২০১১ সালে। আজকে দুনিয়া জুড়ে চলা করোনা অতিমারির প্রকোপে আমরা যখন সকলে ঘরে লকডাউন হয়ে দিন কাটাচ্ছি, তখন এই ছবিটির কথা আমাদের অন্দরমহলে ইতিমধ্যেই পৌছে গিয়েছে। করোনা ভাইরাসের আবির্ভাব ও তার বিস্তারের সাথে এক অদ্ভুত মিল আছে এই ছবিটির। কিন্তু এই সাদৃশ্য সম্পূর্ণই কাকতালীয়। এই পরিসর উক্ত ছবিটির আলোচনা করার জন্য নয়। ২০১৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত আশিখ আবু পরিচালিত ‘ভাইরাস’ ছবিটির সাথে সোদারবার্গের ছবির কাঠামোগত, জঁরগত এবং গল্পের নির্মাণগত কিছু সাদৃশ্য পাওয়া যায়। কিন্তু তা শুধুই সিনেমার ভাষা কেন্দ্রিক। ‘ভাইরাস’ আমাদের সামনে এমন একটা থ্রিলার ড্রামা পরিবেশন করে যা শুধুমাত্র গল্পের রুটের মধ্যেই আটকে থাকেনি। থ্রিলার ছবির ক্ষেত্রে মূলত গোটা ছবির ভরকেন্দ্র থাকে সন্দেহভাজনের ওপরই। মুহসিন পারারি সারফু ও সুহাস দ্বারা রচিত চিত্রনাট্য এক্ষেত্রে কিন্তু শুধুমাত্র সন্দেহভাজনের ওপরই ফোকাস করে থাকেনি, চরিত্র থেকে চরিত্রের অন্তরে প্রবেশ করে এক বিশাল পৃথিবীর সামনে এনে আমাদের দাঁড় করায় যার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে অনেক কাহিনী ও চরিত্রের দর্শন।
২০১৮ সালে কেরালাতে নিপাহ ভাইরাসের প্রকোপ শুরু হয়। সরকারি হিসেব অনুযায়ী কেজুয়ালিটির সংখ্যা ৭৫ জন। নিপাহ অত্যন্ত সংক্রমিত ভাইরাস। যারা মারা গিয়েছিলেন ও আক্রান্ত হয়েছিলেন প্রত্যেকেই নিপাহ দ্বারা সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে নিজেরা সংক্রমিত হন। প্রশাসনের কাজ ছিল দ্রুত এই ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রাজ্যব্যাপী মানুষকে উদ্ধার করা ও তাদের এই সংক্রমণের হাত থেকে বাঁচানো। আশিখ আবু এই ঘটনাকেই সিনেমার পর্দায় নিয়ে এসেছেন। কিন্তু তার মাত্রা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সম্পূর্ণ সরকারি পরিকাঠামোর অন্তরে কিভাবে এই ভাইরাসের রুটকে চিহ্নিত করা হয় ও তাকে সম্পূর্ণ রূপে বিলোপ করা হয় তা এক অনন্য নজির গড়ে তোলে। কিন্তু আশিখ আবুর ছবি এর সাথে নিরলস পরিশ্রম করা সেই সমস্ত মানুষদেরও আমাদের সামনে নিয়ে আসে যাদের কথা আমরা কেউ কখনোই কোন মাধ্যম দ্বারা জানতে পারিনা। আশিখের ছবি একদিকে যেমন সংবেদনশীল অন্যদিকে আবার অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। অসংখ্য চরিত্রের মাঝেও প্রতিটা চরিত্র এখানে সমান ভাবে উজ্জ্বল। তাদের কাজের পারদর্শিতা, ন্যায়পরায়ণতা এবং ত্যাগ খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে একটি ভাইরাসের সংক্রমণকে পুরোপুরি বিনাশ করতে সক্ষম হয়েছিল। তাই আশিখ আবুর ছবি একাধারে সেইসব মানুষদেরকে উৎসর্গ করা যাদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে একটা ভয়ঙ্কর ভাইরাসের প্রকোপের হাত থেকে একটা গোটা জাতিকে উদ্ধার করা হয়েছিল।
আশিখের ছবি শুধুমাত্র ডাক্তার, নার্স, ওয়ার্ডবয়, সাফাইকর্মী এদের মধ্যেই আটকে নেই। কিভাবে সরকারি আমলা থেকে শুরু করে মন্ত্রী, সহ-মন্ত্রী সবাই একযোগে এই লড়াইয়ের অংশীদার হয়েছিল সেই চিত্র দেখাতেও সক্ষম হয়েছে। কিন্তু যে দিক এই ছবিকে আর পাঁচটা এই জঁরের ছবি থেকে আলাদা করেছে তা হল এইসব চরিত্রদের বাইরেইও আরও অন্যান্য চরিত্রের চিত্রায়ন। বিশেষ করে আক্রান্তরা। ছবির চিত্রনাট্যে আক্রান্তদের ব্যক্তিগত পরিসর স্থান পেয়েছে। যার ফলে আমাদের সামনে এক বৃহৎ দুনিয়ার ছবি উন্মুক্ত হয়েছে। সেই দুনিয়ায় মানুষের সাথে মানুষের সম্পর্ক, তাদের রোজনামচা, তাদের ব্যক্তিসত্তা প্রবল ভাবে এক অল্টারনেটিভ স্পেস তৈরি করেছে ছবির মধ্যেই। দুই স্পেসের মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য চিত্রনাট্যে এক নতুন পেশার মানুষকে (পার্বতী অভিনীত চরিত্র) রাখা হয়েছে যার কাজই ছিল কিভাবে আক্রান্তদের ব্যক্তিজীবন সমসময়ে চলতে থাকা ঘটনার মধ্যে নতুন করে থ্রিল সংযোগ করতে পারে। ডাক্তারী ভাষায় তার পেশার একটা খটমট নাম আছে। কিন্তু ছবিতে সে শুধুমাত্র একটা ব্রিজ হিসেবে কাজ করেছে। একটা স্পেস থেকে ঘটনা সংগ্রহ করে অন্য স্পেসে তাকে সরবরাহ করে গোটা ছবি জুড়ে একটা থ্রিলের আবহ তৈরি করেছে।
ছবি শুরু হয় সরকারী হাসপাতালের সকালের দৃশ্য দিয়ে। আমাদের অনেকেরই হয়ত সেই দৃশ্য চেনা। অনেকবার আমরা নিজেরাই হয়ত সামনে থেকে এই দৃশ্য দেখেছি। কিন্তু দৃশ্যের ভয়ঙ্করতা প্রকাশ পায় যখন ঐ তুমুল ভিড়ের মধ্যে একের পর রোগী আসতে থাকে এবং ডাক্তাররা হিমশিম খেতে থাকে প্রত্যেক রোগীর পরিচর্যা করতে করতে। রাজীভ রবি ও সাহজু খালিদের ক্যামেরায় প্রতিটা দৃশ্যই এতই সুনিপুণ ভাবে তোলা হয়েছে ও সাইজু শ্রীধরনের সম্পয়াদনায় তা গাঁথা হয়েছে যে গোটা ছবিকে ফিকশনাল ডকুর সাথে তুলনা করা যায়। সাথে সুশিন শ্যামের সঙ্গীত ছবির গতি ও আবহের মধ্যে একটা রিদম তৈরি করেছে। আক্রান্তদের প্রতিটা ঘটনাই সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরের মতন কিন্তু তাকে চিত্রনাট্যের সাথে জুড়ে যে নতুন আঙ্গিক ছবিতে আনা হয়েছে তা থ্রিলারের সাথে ড্রামাকে যোগ করেছে।
রেভতি, টোবিনো থমাস, পার্বতী, কুঞ্চাকো বোবান, সৌবিন সাহির প্রমুখ অভিনেতা দ্বারা অভিনীত ‘ভাইরাস’ একটি মাল্টিস্টারার ছবি। ছবিতে প্রতিটি চরিত্রই নিজেদের স্পেসে নিজেদের মতন করে সুন্দর কিন্তু গোটা ছবির স্থান কাল পাত্রের নিরিখে এই ছবি স্টারডমের সাথে ডিল করে না। তথাকথিত নায়ক নায়িকা সুলভ পরিকাঠামোকে চিত্রনাট্য জ্ঞাতসারেই বর্জন করেছে। তাই নির্দিষ্ট স্পেস ও স্ক্রিন টাইম সকলের জন্য বরাদ্দ থাকলেও গোটা ছবিটাই সকল চরিত্রের কালেক্টিভ এফোর্ট। প্রায় আড়াই ঘন্টা রান টাইমের এই ম্যামথ জার্নি দর্শকের মনের কৌতুহল নেভানোর সাথে সাথে এক আবেগপ্রবণ গাঁথাও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।