হঠাৎ ঝড়টর বাঁধিয়ে তেড়ে বৃষ্টি এলেই আমার মনে পড়ে নমিতা চৌধুরীর কথা। তাঁকে দেখতে সুন্দর ছিল বলে টাকার কাঙাল বীরেশ্বর রায় এক দেখাতেই বিয়ে করে নিয়েছিলেন। পয়সা জমানো ছাড়া বিরেশ্বরের আর কোন নেশা ছিলনা কখনই। সমস্তরকম ঝঞ্জাট থেকেই তিনি নিজেকে এড়িয়ে চলতেন। নমিতা মুখে না বললেও বিয়ের একমাস পর থেকেই নর্দমার পোকার থেকেও বেশি ঘৃণা করতেন বীরেশ্বরকে। বীরেশ্বরকে দেখতে কুৎসিত। শুধু পয়সা আছে বলে নমিতা কিছু বলেনি তা নয় বিয়ের সময় শর্তই ছিল বিয়ের পর নমিতার ছোট ভাই আবীর তার মাতাল বাপকে ছেড়ে তাদের সাথে থাকবে। বীরেশ্বর আপত্তি করেননি। কিন্তু তিনি আবীরকে দুচোখে দেখতে পারে না। শুধু মুখে কিছু বলে না। কলেজ পাশ করে বের হওয়ার পর আবীর জামাইবাবুকে বলেছিল একটা কাজ খুঁজে দিতে হবে তাকে। বীরেশ্বরের ইচ্ছে না থাকলেও বলেছিল দেবে। তারপর কাউকে কিছু না জানিয়ে আবীর বিয়ে করল অপর্ণাকে। তাকে সে নিপা বলে ডাকে। বিয়ের রাতে উঠল জিগরি দোস্ত আফিফের বাসায়। আফিফের দুটো ঘর। একটা ঘরে ওদের বাসরের ব্যবস্থা হল। সন্ধ্যে হতেই বীরেশ্বর ডেকে পাঠাল আবীরকে। আবীর না চাইতেও তাকে যেতে হল। রাতে ফিরে দেখল নিপা ঘুমিয়ে পড়েছে। এদিকে আবীর ভেবে এসেছিল আজ সারারাত নিপাকে সে নিমাই ভট্টাচার্যের রোম্যান্টিক উপন্যাসের প্লট শোনাবে। এই নিমাই ভট্টাচার্য কে আমিও জানিও না। ওর বই জোগার করে পড়তে হবে।
পরদিন সকালে ভোর হতেই আবীর বেরিয়ে গেল। নিপা তখনও ঘুমাচ্ছে। একটা কাগজে পেন্সিল দিয়ে লিখে দিয়ে গেল " এই অকালকুষ্মাণ্ডটাকে বিয়ে করার জন্য সে নিপার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু বিয়ে হয়ে যাওয়ার পরও তার নিজেকে বিবাহিত মনে হচ্ছে না। দুদিন পর যখন সে ফিরে আসবে এই ব্যাপারে নিপা যেন কিছু ভেবে রাখে।" বিরেশ্বর আবীরকে ট্রাক লোডের ইম্পুট আউটপুটের কাজ দেখার জন্য বোলপুর পাঠাচ্ছে। ড্রাইভার আমজাদ আবীরকে এসে বলল সে উড়িয়ে নিয়ে চলে যাবে। আবীর বলল সে উড়ে যেতে চায় না মানুষরা আবার উড়ে যেতে পারে নাকি! নয়ানজুলীর কাছে একটা ডাম্পারকে ওভারটেক করতে গিয়ে ওদিক থেকে আসা একটা দশ চাকার মুখোমুখি চলে এল আমজাদ। শেষ মুহুর্তে সে শুধু চোখ বুজে নিয়েছিল। আফিফ খবর পেয়ে বাড়ি এসে দেখল নিপা নেই। নিপার বাসায় ফোন করায় ওদের কাজের লোক নারায়ন জানাল ম্যাডাম এখন লিউকওয়ার্ম জলে স্নান করতে গেছে। আফিফ বলল খুব জরুরি দরকার তাকে এখুনি ডেকে দিতে হবে। নারায়ন কিছু না বলে ফোন রেখে চলে গেল।
মেডিক্যাল কলেজে যখন আনা হল আবীরকে তখন নমিতা বীরেশ্বর সবাই এসে গেছে। বিরেশ্বর ফোন করে বড় ডাক্তারকে ডেকে এনেছে। নমিতাকে এও বলেছে দরকার হলে হাওয়াইজাহাজ করে আবীরকে বাইরেও তিনি নিয়ে যাবেন। নমিতার ওপর এসব কথার কোন প্রভাব পড়েনি। আইসিইউর সামনে গিয়ে সে দেখে এসেছে তার ভায়ের নাকে নল লাগানো। মুখটা হা করে খোলা। কিন্তু কেবিনের ফর্মালিনের গন্ধে তার দমবন্ধ হয়ে আসছিল। সে ফিরে এসেছে। বীরেশ্বরকে গাড়ি বের করতে বলেছে, এখন রাত প্রায় নটা, বীরেশ্বরের খাওয়ার সময় হয়ে গেছে। বীরেশ্বর কি বলবে বুঝতে পারছে না৷ কারণ খিদে তার পেয়েছে। বেশিক্ষণ খিদে আবার সে সহ্যও করতে পারেনা। বাইরে বেড়িয়ে নমিতা দেখল বৃষ্টি পড়ছে, গাড়িতে উঠে বীরেশ্বর বলল বাড়ি গিয়ে নমিতা যেন একটু ঘুমিয়ে নেয় তাকে খুব রেস্টলেস লাগছে। নমিতা কোন কথার উত্তর না দিয়ে হুমায়ুন আহমেদের জেবার কথা ভাবছে। জেবার ওপর যেমন মুহিবের অ্যাক্সিডেন্টের কোন প্রভাবই পরেনি সে শুধু ভাবছিল আইসিইউকে যদি একটু সাজান যেত! জেবার মত নমিতাও ভাবছে মৃত্যুর আগে একটু সুন্দর পৃথিবী দেখে লোকগুলো যদি মরতে পারত! কেবিনের ঘরের জানলা গুলো যদি খুলে দেওয়া যেত, ফুলদানিতে সতেজ ক্রিসেনথিয়াম যদি রাখা থাকত, ঘরটা সুগন্ধে ম ম করত৷ এই বৃষ্টি শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই যদি তার ভাইটা চলে যায় তাহলে আর ওর কেবিনটা সাজানো হবে না। যদি রাতে ফিরে এসেও ভাইকে জীবিত দেখতে পায় তাহলে ও ওর স্বামীকে বলবে ঘরটা সাজিয়ে দিতে। গাড়ি থেকে নেমে দেখল বৃষ্টি থেমে গেছে একদম। আকাশে একটু মেঘ নেই। নমিতার বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল। একবার কি হাসপাতালে খোঁজ নেবে? বীরেশ্বরকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না আর। এখন তার বারবার ক্রিসেনথিয়ামের কথা মনে পড়ছে। নিপার খুব পছন্দের ফুল ক্রিসেনথিয়াম। নিপা রাতের খাবার খেয়ে ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে বোলপুর থেকে আবীর তার জন্য ক্রিসেনথিয়াম না পেয়ে পলাশ নিয়ে এসেছে। বাইরে আবার মেঘ করে এসেছে। বৃষ্টি নামার তোরজোড় শুরু হয়েছে। নমিতা ভাবছে বৃষ্টি যেন না থামে। বৃষ্টি থেমে গেলেই বোধহয় তার ভাইটাও থেমে যাবে। ওর ঘরটা আর ক্রিসেনথিয়াম দিয়ে সাজানো হবে না।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।