সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

নস্টালজিয়ার নাম 'আদাত'

তখনো পরিবেশে এত হিংসা ছড়ায়নি। আমরা দেশ বলতে শুধুমাত্র নিজের দেশ বুঝতাম না। যেখানে যা ভালো সবই আছড়ে পরত আমাদের কাছে। যদিও তার পরিমাণ ছিল অনেক কম। ইন্টারনেটের এত ব্যপ্ত প্রচার হয়নি। স্মার্টফোন তখনো বাজারে আসেনি। গৃহস্থের বাড়িতে তখন ল্যান্ডফোনের চল। আশেপাশের বাড়ি থেকে যাতে যে সে এসে যাকে তাকে ফোন করতে না পারে তার জন্য ছিল নাম্বার প্যাড লক। ছোট তালা দিয়ে একটা কেস মতন করে নাম্বার প্যাড আটকানো থাকত। ঠিক এইরকম সময়ে আমরা তখন কৈশোরে। আমাদের খেলার মাঠগুলো সকাল বিকেল ভর্তি থাকত ব্যাট, বল উইকেটে।  সকাল হলে পাড়ার মোরে চায়ের দোকানে আড্ডা জমত। খেলার দিনগুলোতে ক্লাবঘরগুলোতে তিল ধারনের জায়গা থাকত না। গান বলতে তখনো ৯০ দশকের হিন্দি গান বা নতুন আবির্ভাব হওয়া বাংলা জীবনমুখী গান। আমরা খুব দ্রুত গতিতে নতুন শতাব্দীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। নতুন শতাব্দী আমাদের জন্য অনেক কিছু নিয়ে এসেছিল তার মধ্যে অন্যতম এফএম রেডিও। ক্লাস নাইনে থাকতেই পুজোতে পাওয়া টাকা জমিয়ে কিনে ফেলেছিলাম পকেট রেডিও। গান শোনার শুরু সেই থেকে। এতগুলো কথা বললাম কারন এমন একটা গানের কথা আজ বলব যেটা সেই সময় থেকে শুরু করে আজো আমাদের অনেকের পছন্দের তালিকায় আছে৷ এখনো মন খারাপ হোক বা ক্লান্তি হেডফোনে বেজে চলে সেই গানের সুর৷ 
গোহর মমতাজ তখন সদ্য তরুণ, লিখে ফেলেছেন একদম নতুন এক গান, সুরও বসিয়ে দিয়েছেন তাতে। এবারে খুঁজছেন নতুন প্রতিভাদের। যাদের সাথে মিলে সে একটা ব্যান্ড তৈরি করতে পারে।  একটি কলেজ ফেস্টিভ্যালে একদিন একদম অন্যরকম গলার এক যুবককে শুনলেন, অফার দিলেন নিজের ব্যান্ডে জয়েন করার। যুবক রাজি হল। গোহর মনে করতেন সঙ্গীতের সাথে পরিবেশের খুব নিবিড় যোগ আছে। তাই ব্যান্ড এর নাম রাখলেন পরিবেশে তথা আমাদের শরীরে যার উপস্থিতি সবচেয়ে বেশী। উর্দুতে ব্যবহৃত পারসি শব্দ 'জল'(Jal The Band - (Official Facebook Group)। যে গানটা গোহর লিখেছিলেন সেটা ২০০২ সালে অডিও রিলিজের পর ২০০৪ সালে ভিডিও হিসেবে বের হয়। চূড়ান্ত পপুলার হল সেটা। গানটি সেইসময় গোহরের দেশ পাকিস্থান থেকে একটি বেসরকারি ওয়েবসাইট থেকে রিলিজ হওয়ার পর সবথেকে বেশী ডাউনলোড হয়েছিল।  সেই বছরই তারা সেই গানের নামেই নিজেদের প্রথম অ্যালবাম বের করলেন। কিন্তু ততদিনে সেই যুবক যাকে গোহর ব্যান্ডের লিড ভোকালিস্ট হিসেবে নিয়ে এসেছিলেন সে ব্যান্ড ছেড়ে সোলো গাইতে চলে গেছেন। পরবর্তীতে সেই যুবক সেনসেসনাল গায়ক হবেন। তিনি আতিফ আসলাম। তার জায়গায় ব্যান্ডে এসেছেন অতীব সুশ্রী এক যুবক ফারহান। 
আমাদের কানে গানটি এসেছিল রিলিজ হওয়ার প্রায় বছরখানিক পর। প্রথমবার শোনার পরই আমরা সবাই সেই গানের প্রেমে পরে যাই। বলা ভালো পছন্দের তালিকায় একদম সবার উপরে ছিল গানটা। তখনও আমার বাড়িতে টেলিভিশন আসেনি। রেডিওতে কোন সময়ে গানটা দেওয়ার সুযোগ আছে সেই সময় থেকে এফএম চালিয়ে শোনা শুরু করতাম। ভাগ্যভালো থাকলে হয়ত শুনতে পেতাম। পরবর্তীতে যদি-ও একটা ব্যবস্থা হয়েছিল। আমাদের সবার মধ্যে একমাত্র আমার এক বন্ধুর বাড়িতে ছিল ক্যাসেট প্লেয়ার। দুটো ছোট ছোট বক্স সমেত। কিন্তু তাতে যে প্রধান সুবিধাটা ছিল সেটা হল এফএম থেকে ব্ল্যান্ক ক্যাসেটে ডিরেক্টলি গান রেকর্ড করা যেত। আমার সেই বন্ধু একদিন গোটা গানটা রেকর্ড করে নিল। তারপর থেকে সোনায় সোহাগা। যদিও সেই অ্যালবামের অন্য গানগুলি শোনার জন্য আমরা অর্ডার দিয়ে অ্যালবামের ক্যাসেট আনিয়ে সেই বন্ধুর জন্মদিনে তাকে উপহার দিই। আমাদের নিজের বাড়িতে কোন ক্যাসেট প্লেয়ার না থাকায় আমাদের গন্তব্য থাকত আমার বন্ধুর বাড়ি। এরপর বাড়িতে টিভি এল। সে বছর ফুটবল বিশ্বকাপ ছিল। আমাদের স্কুলের গন্ডি তখন শেষের পথে। বেশ কিছু ইন্ডি-পপ শো তে গানটা তখনও চার্টবাস্টার ছিল। স্কুলের পিরিয়ডে বা ব্যাচে পড়ার ফাঁকে আমরা খোঁজ নিতাম কোন চ্যানেলের কোন শো তে গানটা দেখানো হয়েছে। বাড়ি ফিরেই অপেক্ষা থাকত সেই শোএর রিপিট টেলিকাস্টের৷ গানের ভিডিওর থেকেও গানের সুরে ও কথায় আমরা বারবার মূর্ছনা যেতাম। কেন যেতাম সে কথা ভাবতে গিয়ে কিছুই মনে পরল না। শুধু মনে পরলো পড়া থেকে ফেরার দিন, স্কুলের টিফিনে হঠাৎ  করে গেয়ে ওঠা, শীতকালের ভোরবেলার কুয়াশা, পূর্ণিমা রাতে গঙ্গার ধারের আড্ডা, টো টো করে সাইকেল নিয়ে ঘোরা, ভেজা ক্যাম্বিস বলের দাগ, ক্রিকেট ব্যাটে হাকানো ছয় আর কিছু না পাওয়া প্রেম, যেগুলো হয়ত কোনকালেই হওয়ার ছিলনা তবুও আমরা ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম বলেই আজো মনে রেখেছি। অভ্যাসের বশে। 'আদাত'। হ্যাঁ গানটা ছিল 'আদাত'।
https://youtu.be/wJJBUtzjfgg

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...