সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

আসুরান- ভাত ও জাতের লড়াই।

'আসুরন' শব্দটির অর্থ অসুর বা রাক্ষস। পোমানি রচিত 'ভেক্কাই' উপন্যাস অবলম্বনে পরিচালক ভেটরিমারান পরিচালিত ছবি 'আসুরান'। ছবির গল্প দুটি সময়ের। একটি সময় ষাটের দশক আর অন্যটি আশির দশক। যদিও সময়ের প্রেক্ষাপট বোঝানোর দায় থেকে পরিচালক নিজেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন। স্বাধীনতা উত্তর ভারতে অস্পৃশ্যতা তখনো স্বমহিমায় বিরাজ করছে। জাতের নিরিখে ভেদাভেদ সমাজে খুব স্পষ্ট। যদিও বোঝা যায় সরকার থেকে পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নতির স্বার্থে নানান পরিকল্পনা করা হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় স্কুলের দরজা সকলের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে। সরকার বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে শিক্ষাই সমাজের সমস্ত ভেদাভেদ দূর করতে পারে। সমাজের সকল অংশের মানুষ তাদের সন্তানদের সেখানে পড়তে পাঠাচ্ছে। জাতি বর্ণ নির্বিশেষে সেখানে তারা পড়ছে। কিন্তু বাইরের পৃথিবী তখনো জাতিপ্রথার গুমোট হাওয়ায় জর্জরিত। সেই গুমোটভাব এখনো কাটেনি। সমাজ সংস্কার  হচ্ছে। এর পরবর্তী অংশ অর্থাৎ আশির দশকে এসে আমরা দেখতে পাই যে ভূমি সংস্কার হয়ে গেছে। জমির পাট্টা শুধুমাত্র জমিদার হাতে আর নেই। নিম্নবর্গীয়, নিচুজাতের মানুষদের হাতেও তাদের জমির পাট্টা আছে। নেই শুধু সমাজে স্থান। তারা একঘরে। উচুজাতের মানুষদের কাছে চক্ষুশূল। 
কিছুদিন আগেও খবরের শিরোনামে ছিল তামিলনাড়ুর এক অংশে দলিতরা একটি ব্রিজের ওপর দিয়ে তাদের জাতের কারোর মৃতদেহ নিয়ে যেতে পারেনা। উঁচু জাতের লোকেরা তাদের জন্য এই বিধির বিধান বেধে দিয়েছে। খবরে প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথেই এই ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। কিন্তু ভাবুন কত দীর্ঘ বছর ধরে এই নিয়ম চলে আসছে। ভারতবর্ষ ভিন্ন জাতির দেশ। ভিন্ন ধর্মের দেশ। বহুকাল ধরেই অঘোষিত নিয়মে ধর্মের নামে, জাতের নামে মানুষে মানুষে ভেদাভেদ সৃষ্টি হয়েছে। 'আদুকালাম' থেকে শুরু করে 'ভিসারানাই', 'ভেদা চেন্নাই' হয়ে 'আসুরান'এও ভেটরিমারান পারিপার্শ্বিক পরিবেশের বাস্তব চরিত্রদের তুলে ধরতেই সচেষ্ট হয়েছেন। কিন্তু এই ছবিতে সময়ের ক্ষেত্রে অনেকটা পিছয়ে গেছেন তিনি। আধুনিকতার নিরিখে তিনি বেছে নিয়েছেন গ্রামের প্রেক্ষাপট। সেখানকার ঘরবাড়ি, চরিত্র, রাজনীতি এবং জাতিভেদ প্রথাকে। 
ছবির গল্পকে চিত্রনাট্যে মানিমারান ও ভেটরিমারান এমনভাবে ভেঙেছেন যেখানে ছবি শুরু হয় 'চেজ' ফ্লিমের জঁর কে মাথায় রেখে। ছবি শুরুর দৃশ্যে জ্যোৎস্নার আলোয় বিকশিত জঙ্গলের ছায়া পরেছে জলের ওপর। অত্যন্ত মনোমুগ্ধকর সেই দৃশ্য। কিন্তু এক লহমায় সেই সৌন্দর্য্যএর পতন হয় জলের মধ্যে দুটি পা পরার দৃশ্যে। প্রথম সিকোয়েন্সই বর্ণনা করে দেয় আসলে আমরা কোন সুনদর কিছু নয় বরং কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি হতে চলেছি। ছবির গল্প যত এগোয় তত তা একটি রিভেঞ্জ ড্রামাতে পরিবর্তিত হয়। এই আঙ্গিকও ভেঙে যায় বিরতির ঠিক আগে। তখন ছবি পুরোদস্তুর অ্যাকশান রিভেঞ্জ ড্রামা। বিরতির পর ছবি ফ্ল্যাশব্যাকের গল্প বলে। ফ্ল্যাশব্যাক গিয়ে ছবি প্রধান চরিত্রের চরিত্রায়ণ করে। ছবি শুরু থেকে প্রধান চরিত্র শিবস্বামীকে যেভাবে চালিত করে এসেছে, তার যে যে বৈশিষ্ঠ্য ফুটিয়ে তুলেছে, সেখানে ফ্ল্যাশব্যাকে সম্পূর্ন অন্য শিবস্বামীকে দেখানো হয়। ছবির আঙ্গিক তখন সম্পূর্ন 'ড্রামা'। চরিত্রের বৈশিষ্ঠ্যও সম্পূর্ন আলাদা। যে শিবস্বামীকে আমরা দেখে এসেছি নিজের পরিবারকে বাঁচাতে উঁচু জাতের মানুষদের পায়ে ধরে ক্ষমা চাইতে, সেই শিবস্বামীই জাতের তোয়াক্কা না করে পরিবারের ওপর হওয়া অপমানের বদলা নিচ্ছে। ভেটরিমারানের দক্ষতা এইখানেই যে তিনি এই ছবিকে কখনই একটি নির্দিষ্ট জঁরের ছবি হিসবে দেখাননি। এই ছবি যতটা সময়ের গভীরে গিয়ে তার মূল্যায়ন করে ঠিক তেমনভাবেই চরিত্রের চারিত্রিক বৈশিষ্ঠ্যের ঠিকভূলের বাইরে গিয়ে তাঁকে সময়ের থেকে এগিয়ে দেয়। একটা গোটা জাতির মুখপাত্র হিসেবে সামনে দাঁড় করায়। আমাদের সামনে আয়না ধরে সে ঠিক ভূলের পাঠ শেখায়। শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে! 
এই ছবির সবচেয়ে বড় পাওনা ধনুষ। এতগুলো বছর পার করে এসে সুপারস্টারের তকমা গায়ে নিয়ে যে সাবলীল ভঙ্গিতে দুটি নিম্নবর্গীয় চরিত্রকে তিনি ফুটিয়ে তোলেন তা এককথায় কুর্নিশের দাবী জানায়। ছবির প্রথমার্ধে বয়স্ক শিবস্বামীর চরিত্রে কোন প্রস্থেটিক মেকআপ ছাড়া পঞ্চাশোর্ধ একটি মানুষের চরিত্র মূল্যায়ন করতে গিয়ে অভিনেতা ধনুষ বিভিন্ন আঙ্গিক বেছে নিয়েছিলেন। যেমন অত্যন্ত ধীরস্থির কথাবার্তার ধরন। হাটাচলার মধ্যে বার্ধক্যের ভাব তুলে ধরা (একটু খুড়িয়ে হাটা)। এক্সপ্রেশন প্রকাশের ক্ষেত্রে অত্যন্ত ডাউন টু আর্থ থাকা। এবং উত্তেজনা প্রকাশের সময়েও বয়সের ভার তার চোখেমুখে ফুটিয়ে তোলা। ঠিক তার বিপরীত চরিত্র অল্প বয়সের শিবস্বামী। যৌবনের আগুনের তেজে ফুটতে থাকা এক তরুণ। যে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অভিমত গড়ে তুলতে আইনকেও তোয়াক্কা করেনা। জাতিভেদ প্রথার ধার ধারেনা। সম্পুর্ন বিপরীত দুটি চরিত্র, আর ঠিক ততটাই সাবলীল অভিনয়।
আমরা সকলেই জানি যে আজও আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রদেশে জাতিভেদ প্রথা চূড়ান্ত আকারে নিজের জাল বিছিয়ে রেখেছে। আর সেই জালে বারবার ধরা দিচ্ছে গরীব মানুষের শরীর। তাঁকে কখনও আলাদা করে একঘরে করে দিচ্ছে আবার কখনও মৃতদেহ হিসেবে সমগ্র জাতের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে উক্ত ঘটনা থেকে শিক্ষা নেওয়ার জন্য। ছবির শেষে শিবস্বামী ঠিক এই শিক্ষা নেওয়ার কথাই বলছে। সে বলছে ঘরবাড়ি টাকাপয়সা সব কেড়ে নিতে পারবে কিন্তু শিক্ষা, তা কখনো কাড়তে পারবে না। শিক্ষা থাকলেই দূর করা যাবে সমাজের এই বিষক্রিয়াকে।।
পরিচালনা- ভেটরিমারান।
অভিনয়ে- ধনুষ, মঞ্জু ওয়ারিয়র, টিজে অরুনাচলম, আম্মু আভিরামি, কেন কারুনাস এবং প্রকাশ রাজ।
চিত্রগ্রহন- ভেলরাজ।
সম্পাদনা- আর রমর।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...