মানবজাতির একটি দীর্ঘ ইতিহাস আমরা বয়ে নিয়ে চলেছি। ফলত আমরা আমাদের পরিবর্তনের কথা স্পষ্ট জানি । আমরা জানি আমরা কী ছিলাম আর কী হয়েছি। ইতিহাস সাক্ষ্য আছে তার। কিন্তু আমরা কোনদিকে এগিয়ে চলেছি? আমাদের ভবিষ্যৎ কিসের অপেক্ষায় আছে? তার উত্তর আমাদের বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে লুকিয়ে আছে। যে সমাজ এখনও নারী পুরুষের সমানাধিকারকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যখন বারবার টক্সিক মাস্কুলানিটি বা পুরুষতন্ত্রের বিষের আক্রোশে পড়ছে, সেই অবস্থানে আমাদের সকলের বিশেষ করে পুরুষ জাতির অবস্থান নিজেদের মধ্যে কোথায়? তাদের চিন্তাধারার বিবর্তনের ইতিহাস কীভাবে বহন করে চলেছে সময়? ভেবে দেখা হয়নি কখনও। ভাবলে পরে আঘাত লাগতে পারে আমাদের নিজেদের অন্তরে। আমরা ভাবিনা তাই। কিন্তু গোটা সমাজের ওপর পুরুষজাতির দৃষ্টিভঙ্গি কেমন? তাদের নিজেদের সম্বন্ধেও তাদের ভাবনা কী? এইসব প্রশ্নের আক্রোশে একটা জাতিকে কখনো পড়তে হয়নি। নির্বিধায় শতকের পর শতক তারা তাদের আধিপত্য বিস্তার করে গেছে। নারীকে করেছে বন্দী, ও পরিণত করেছে যাতনার বস্তু হিসেবে। এই পৃথিবীর সম্পদকে,প্রাণীকে তারা নির্বিধায় নিজের প্রয়োজনে ধ্বংস ও হত্যা করেছে। টক্সিক মাস্কুলানিটি নিজেকে উন্নত প্রমাণ করার চেষ্টা করেছে বারংবার।
উন্মত্ত ষাঁড়কে একদল জনতার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। হিউম্যান বনাম বিস্টের এই লড়াইকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে উপভোগ করা হয় । রক্তের স্রোত, মৃত্যুর হাহাকার উপেক্ষা করে মানুষ শুধু আমোদকে উপভোগ করে গেছে এবং একদল বিনা বুদ্ধিব্যায়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রমাণ করার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটা নিরীহ প্রাণীর সাথে যুদ্ধে মেতে উঠেছে। তামিলনাড়ুর অন্যতম জনপ্রিয় খেলউৎসব জাল্লিকাট্টু। মালায়লম ছবির পরিচালক লিজো জোশ পাল্লিশারির সপ্তম ছবি এস হারিশ এর ছোটগল্প 'মাওইস্ট' অবলম্বনে 'জাল্লিকাট্টু'। ক্ষিপ্ত উন্মত্ত প্রতিশোধ পরায়ণ পুরুষ জাতির রূপক বর্ননার কাহিনী 'জাল্লিকাট্টু'। যদিও যে কাহিনীর বিন্যাস শৈলী আমরা দেখতে অভ্যস্ত ছবিতে তার থেকে অনেক আলাদা বিন্যাস এই ছবির। কাহিনীর থেকেও শুধুমাত্র পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে এই ছবির বিন্যাস রচনা করেছেন এস হারিশ ও আর জয়াকুমার। প্রিমিটিভ বা আদিম যুগ থেকেই পুরুষ জাতির মধ্যে প্রতিযোগিতার বীজ বপন করা ছিল। নিজেকে শ্রেষ্ঠপ্রমাণ করার জন্য তার লড়াই নিজের জাতির মানুষদের মধ্যেও রক্তের স্রোত বইয়ে দিয়েছে। কিন্তু সর্বত্তম প্রমাণ করার এই যে আকাঙ্ক্ষা তা আজও বর্তমান। পরিচালক এই আকাঙ্খাকে যে ব্যপ্ত আকারে প্রকাশ করেছেন তাই ছবির মূল আখ্যান। আখ্যানের মধ্যে দিয়ে যে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন তা একশো শতাংশ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। মানুষে মানুষে বিবেদের সূচনাতেই রাজনীতির অনুপ্রবেশ ছিল। একদল অন্যদলের থেকে সক্রিয় ও শক্তিশালী প্রমাণের এই লক্ষ্য আদিম যুগ থেকে বিরাজমান। শুধু তার পরিসর গুলো বদলেছে। এই আখ্যানের শুরুতে ক্লোজ শট, দ্রুত ছান্দিক সম্পাদনা ও ঘড়ির কাঁটা ঘোরার জোড়ালো শব্দের বিন্যাসে যে চোখগুলো জেগে উঠছিল তাদের মধ্যে এক লালসার নেশা বারবার ফুটে উঠছিল। কিছু হাসিল করার নেশা, লোভের নেশা। এই লোভ লালসা পরবর্তীতে বিন্যাসিত হয় প্রাণী হত্যা ও তার রক্ত মাংসের শরীরের টুকরোর শব্দ পরিবর্তী মাংসের চাহিদায়।
কেরলার ইডুক্কি জেলার একটি পাহাড়ি গ্রামে জাল্লিকাট্টুর কাহিনীর পরিসর স্থাপন হওয়ার পর ছবির গল্প শুধুমাত্র একটি মহিষ জবাইখানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। আসলে যে জংলী মহিষটাকে খোঁজার জন্য যেভাবে গ্রামশুদ্ধু পুরুষ মানুষ দিনরাত এক করে দিল, সেই আবহ বাতাবরণের মধ্যে আছে। আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে গ্রাম রক্ষার তাগিদে সবাই একত্রিত হয়ে মাঠে নেমে পরেছে, কিন্তু পরিচালক অতি সুক্ষভাবে যে বিন্যাস রচনা করেছেন গিরিশ গঙ্গাধরনের চিত্রগ্রহনের শৈলীর মাধ্যমে আসলে তা অতি দৃঢ়ভাবে আমাদের সকলের ওপর কড়াঘাত। পুরুষ মানুষের মধ্যে পুরুষ মানুষের প্রতি যে প্রতিশোধপরায়ণতা, নারীর প্রতি তার যে দৃষ্টিভঙ্গি, সমাজের ওপর তার যা চাহিদা, সর্বত্তম প্রমাণের লক্ষ্যে যে হিংস্রতা তারা বয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে তার একটি উপর্যুপরি পর্যালোচনা ও স্বয়ংক্রিয় আবির্ভাবের আখ্যান এই ছবিকে ঠিক যেমন ভাবে একটি মনোরঞ্জনমূলক ছবির তকমা দেওয়া যায় ঠিক তেমন ভাবেই এইছবির দ্রুততা, ছবির ক্রাফটের যথেচ্ছ ব্যবহার, দৃশ্যাবলীর রচনা, দৃশ্য গ্রহণের অবয়ব পরিমণ্ডলী, সম্পাদনার ছান্দিক গতিময়তা, শব্দের ব্যবহার, আবহ সঙ্গীতে প্রিমিটিভ কালচারের আভাষ এই ছবিকে একটি এক্সপেরিমেন্টাল ও আভঁ গার্দ ছবির তকমাতেও ভূষিত করে।
ছবির সবচেয়ে বড় পাওনা প্রশান্ত পিল্লাইএর সঙ্গীত ও রংগনাথ রভির সাউন্ড ডিজাইন। শব্দের ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যেমে যে ভাষার ব্যবহার করেছেন তা আনুষঙ্গিক ভাবে নিজেদের মধ্যে নিমত্ত হিংসা বা দ্বেষের পরিপূরক। নিয়মিত শ্বাস গ্রহণ ও বর্জনের যে অতিমাত্রিকক শব্দ ছবিতে বারবার ফিরে আসে ও তার সাথে ঘড়ির কাঁটার তীব্র জোড়ালো শব্দ দর্শকের মধ্যে
ক্রমাগত এক হ্যামারিং করে চলে যে যা ঘটছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার যেন অন্তরের অন্দরে হতে থাকে। ব্যক্তি চরিত্র ও অনুভূতি ছবিতে জতটা না স্থান পেয়েছে তার চেয়ে বেশিমাত্রায় আলোচনা করা হয়েছে মাসের (বা দলের), গোষ্টির চিন্তাধার ও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ ব্যক্তির কার্য সম্পাদনের মাধ্যমে বারবার সুক্ষ ভাবে ফুটে উঠেছে দৃঢ় আঙ্গিকে। ছবির শেষে মহিষের মৃতদেহের অনতিদূরে যে মনুষ্য পাহাড় গড়ে উঠল নিমেষের মধ্যে শুধু এই আকঙ্খায় সবাইকে সরিয়ে সবার উপরে কে থাকবে মুহুর্তে তা রক্তের স্রোত, আর্তনাদ ও মৃত্যুর হাহাকারে হারিয়ে গেল। কিন্তু আমাদের চেতনায় রয়ে গেল আদিম যুগের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ন এক উদাহরণ হিসেবে।
আংলোমালি ডায়েরি, ই মে ইয়া, জাল্লিকাট্টু একাধারে লিজো জোশ পাল্লিশারিকে যেমন কাল্ট ফিগারে পরিণত করেছে তেমনি তার ছবিতে বারবার মবের বা গোষ্ঠীর উঠে আসা কে প্রাসঙ্গিক প্রমাণ করেছে ছবির বিন্যাশ ও অসাধারন প্রযুক্তিগত পারদর্শিতায়।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।