'Revelations' শব্দের বাংলা অর্থ 'উন্মোচন' বা 'উদঘাটন'। আমাদের প্রত্যেক মানু্ষের জীবনে রয়েছে এমন অনেক রহস্য যা সবার সামনে উন্মোচন হয় না। হয়তো কোনো এক পরিসরে কোনো এক মুহুর্তে বেরিয়ে আসে সেই সত্য। সময় স্থান কাল পাত্র উপর নির্ভর করে সেই সত্য উন্মোচন । নবাগত পরিচালক বিজয় জয়পাল তাঁর প্রথম ছবি 'রেভেলেশনস' এর পর্দায় উন্মোচিত হয়েছে কলকাতা শহরের প্রেক্ষাপট। শহরের প্রত্যন্ত অলিগলি, রাস্তা ঘাট, নদীর ধারে অনবরত ঘুরে বেরিয়েছে ক্যামেরা। পর্দায় ফুটে উঠেছে আনকোরা অথচ পরিচিত কলকাতার এক ছবি। ভিন্ন জাতি, ভিন্ন ভাষার মানুষ যখন এই শহরে এসে উপস্থিত হন তখন আমাদের থেকেও তাঁদের জীবনে এই শহরটার একটা প্রভাব দৃঢ় হয়। জীবনের আনাচে কানাচে ঢুকে থাকে শহরের খোলনলচে।
ছবির গল্প ঘুরতে থাকে তিনটে চরিত্রের মধ্যে দিয়ে, যাঁদের জীবনে মানুষজন থাকলেও আদতে তাঁরা সম্পূর্ণ একা। আর প্রত্যেকের সঙ্গে আছে প্রত্যেকের নিজস্ব সত্য। যা কোনো এক সময়ে কোনো এক পরিসরে বেরিয়ে আসবে আমাদের সামনে । আমাদের অপেক্ষা শুধু সেই সময়টুকুর। পরিচালক একটি ইন্টারভিউতে বলেছেন যে তিনি একটি তামিল ছবির প্রেক্ষাপট কলকাতার মত শহরে সেট করছেন কারন তিনি এমন একটা পরিসর চান যেখানে একাকিত্ব বাতাসের আবহে মিশে আছে ৷ কারণ ছবির চরিত্রের সাথে সাথে শহরও অদেখা, নাবোঝা আরো একটি চরিত্র। তাই কলকাতাকে বেছে নেওয়া। কারণ এই শহরের বাতাসে ঘুরে বেড়ায় কবিদের না পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।
ছবিটি প্রায় কুড়িটি ভিন্ন ভাষার সাবটাইটেল সমতে বেশ কিছু ফেস্টিভেলে দেখানো হয়েছিল। ২১তম বুসান চলচ্চিত্র উৎসবে এই ছবিটি ছিল অন্যতম আকর্ষণ। যদিও ছবিটি কমার্শিয়ালি মুক্তি পায়নি, কিন্তু ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে।
ছবির শব্দ, আবহসঙ্গীত, সম্পাদনা এমন এক ছন্দের বহমানতায় ছবিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে যেন বারবার ছবির পর্দা জুড়ে আছড়ে পড়েছে একাকিত্বের দীর্ঘশ্বাস। পরিচালক যে 'আইসোলেশন' বা একা হয়ে যাওয়ার আঙ্গিকে চরিত্রগুলোকে সাজিয়েছিলেন সেই আঙ্গিকে আরো একা লেগেছে শহরের পরিসরকে। যেন ফাঁকা ধু ধু এক শহর। গুটিকয়েক মানুষ যাঁরা আছে তাঁরাও যেন বড় একা, তাঁরাও যেন কেউই শোভা, কল্যানী, সার্থকের পাশে এসে দাড়াবার কথা ভাবে না। এঁদের একাকিত্ব যেন ঘুরপাক খায় এঁদের ঘরের পলেস্তারা খসা দেওয়ালে, ছাদের রেলিংএ, চায়ের গ্লাসে, ভেজা জামাকাপড় মেলার দড়িতে ও একে অপরের চোখের চাহনিতে।
হয়তো আমরা প্রত্যেকেই একা, আমাদের চাহিদাগুলোও একা শুধু একে অপরের পরিসর আলাদা। যেভাবে শোভা সার্থকের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েও ভাবতে পারে না কল্যানীর সাথে থাকবে , যেভাবে সার্থক শোভার থেকে আলাদা হয়ে গিয়েও আর থাকতে চায় না দিভ্যার সাথে, যেভাবে কল্যানী বলে শোভাই সিদ্ধান্ত নিক সে কী করবে, ঠিক এইভাবেই যাঁদের কাছে আসার কথা ছিল তাঁরা কেউই একে অপরের কাছে না এসে নিজেদেরকে দূরে সরিয়ে রেখে এই অজানা অচেনা মানুষের ভিড়ে এই শহরেই কোথাও হারিয়ে যায় অকাতরে আমাদের অনেকের মতই ।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।