সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ভিসারানাই (Visaranai):- ক্ষমতার চরিত্রায়ন

এম. চন্দ্রন কুমার ওরফে অটো চন্দ্রন পেশায় অটোরিকশা ড্রাইভার। বয়স ৫৩। নিবাস তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুর। মেয়ে জিভা ফটোগ্রাফিতে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট। দশম শ্রেণী পাশ করার আগেই স্কুল ছেড়ে দেওয়া কুমারের সম্বন্ধে তার সাথী অটোরিকশা ড্রাইভাররা বলে ওনার জীবনকে দেখার আলাদা একটা ভিসন আছে, কখনও অটোর লাইনে থাকার সময় বা কখনও ট্র্যাফিকে আটকে থাকার সময় উনি গভীর ভাবে মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেন, তাদের জীবনধারণের শৈলীকে লক্ষ্য করেন।

সময়টা ছিল ১৯৮৩ সালের মার্চ মাস, কুমার বাড়ি থেকে অশান্তি করে পালিয়ে এসেছিল অন্ধ্র প্রদেশের গুন্টুরে। তেলেগু প্রধান অঞ্চলে কুমার পেট চালানোর জন্য কাজ করত একটি হোটেলে। হঠাৎ একদিন পুলিশ এসে তাঁকে এবং তার সাথে আরও তিনজনকে তুলে নিয়ে যায়। যদিও তাদের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ ছিলনা। উপরওয়ালার চাপের কারনে একটি কেসকে বন্ধ করে দেওয়ার জন্য প্রয়োজন ছিল কিছু তামিলদের, আর প্রয়োজন ছিল তাদেরকে দিয়ে কনফেস করিয়ে নেওয়ার যে সেই কেসের সাথে তারা যুক্ত। কিন্তু কুমার ও তার সাথে থাকা আরও তিনজন কনফেস করতে রাজি হয়নি তাই তাদের ওপর চলেছিল অকথ্য অত্যাচার। ১৫ দিন তাদের জেলে রাখার পর অন্য আরেকটি জেলে তাদেরকে স্থানন্তর করে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে অত্যাচারেরে মাত্রা ছিল আরও বেশি, কিন্তু তা সত্ত্বেও যে অপরাধ তারা করেনি সেই অভিযোগ স্বীকার করতে রাজি হয়নি। সাড়ে পাঁচ মাসের জেল হেফাজতের পর ১৯৮৪ সালে কুমার ফিরে এসেছিল আবার কোয়েম্বাটুরে। কিন্তু তার কাছে কোন খবর ছিল না তার সাথে থাকা আরও তিনজনের। এরপর ১৯৯২ এবং ২০১৪ তে আবার সে ফিরে যায় গুন্টুরে কিন্তু সেই তিনজনের কোন খোঁজ সে পায়নি। বিনা দোষে জেল হেফাজতের পর কুমার এবং তার সাথীদের ওপর পুলিশ যে অত্যাচার করেছিল সেই বর্ণনা নিয়ে ২০০৬ সালে কুমারের প্রথম উপন্যাস বেরোলো ‘লক আপ’। আর সেই উপন্যাসকে অবলম্বন করে ২০১৬ সালে ভেট্রিমরন বানালেন ‘ভিসারানাই (Visaranai)’, যা এই বছর ভারত থেকে অস্কারে যাওয়ার জন্য মনোনীত হয়েছে। 


‘আদুকালাম’এর পর ‘ভিসারানাই’ আবার এই বছর জাতীয় পুরষ্কার এনে দিয়েছে ভেট্রিমরনকে। ভিসারানাই সম্বন্ধে বলা যেতে পারে যে এটি একটি সুন্দর ছবি কিন্তু এর মধ্যে কোন সৌন্দর্য নেই, তার প্রতিটা ফ্রেম আমাদের ক্রমাগত সমাজের একটি বিশেষ শ্রেণীর বলপ্রয়োগের কুৎসিত দৃশ্যের সাথে পরিচয় করায়। যে দৃশ্য দেখতে আমরা সচরাচর অভ্যস্ত নই। ক্ষমতা চিরকালই অন্যায়কে স্বীকৃতি দিয়ে এসেছে। আর এই স্বীকৃতিই কিছু নিরপরাধ মানুষকে চিরকাল সেই অন্যায়ের কাঁটাতারে বিদ্ধ করে এসেছে। ইহা চির সত্য। আমরা অনেকেই এই সত্য সম্বন্ধে অবগত কিন্তু ক্ষমতার কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য। ‘ভিসারানাই’ আমাদের কাছে নতুন করে এই সত্যকে উন্মোচন করেনি। পরিচয় করিয়েছে অন্য এক দগদগে, রক্তাক্ত, ভয়াবহ পরিস্থিতির সাথে। কি হয় যখন ক্ষমতা হাত বাড়িয়ে আমাদেরকে তুলে নিয়ে যায়? কি হয় যখন আমরা ক্ষমতার কাছে মাথা নোয়াতে রাজি না থাকি? ক্ষমতা একটি প্রক্রিয়াশীল মাধ্যম, যার আওয়াজে আমাদের কানে তালা লেগে যায়, গলা শুকিয়ে আসে। পান্ডি এবং তার সাথে থাকা তার সহচরদেরও ঠিক তাই হয়েছিল যখন তারা প্রথমবার ক্ষমতার আস্ফালন শুনেছিল। কিন্তু তারপরে কি হয়েছিল? যা হয়েছিল তা অত্যন্ত ভয়ানক, শিউরে উঠার মতন। এস. রামালিঙ্গমের ক্যামেরা আর পরিচালক ভেট্রিমরনের স্ক্রিপ্ট এই ভয়ানক পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছে। ছবির প্রথম হাফ ক্ষমতার দ্বারা এই দগদগে ঘায়ের পরিস্থিতির কথা বলে আর দ্বিতীয় হাফ বলে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ক্ষমতার হিপক্রেসির কথা। কিন্তু দুটি পরিস্থিতিতেই হাঁড়ি কাঠে বলি হয় নিরপরাধ সাধারণ মানুষ। ক্ষমতার আস্ফালন মধ্যবৃত্তের দেওয়াল ভেদ করে বেডরুমে প্রবেশ করলেও তাকে দরজার বাইরে আসার সাহস দেয়না। কিন্তু সিনেমার সুবিধা বোধহয় এই জায়গাতেই যে সে তার দর্শককে এই আস্ফালন এবং এই ভয় সম্বন্ধে অবগত করতে পারে। ‘ভিসারানাই’ আমাদের এই ফ্রাকচুয়াল ট্রুথকে অ্যাকচুয়ালি দেখাতে সমর্থ হয়েছে। 


একদা রাম গোপাল ভার্মা তার ‘রক্ত চরিত্র’ ছবিটি নিয়ে বলেছিল যে এই ছবিটি মহিলাদের এবং পরিবারের সাথে বসে দেখার উপযোগ্য নয়, কারণ সমাজের অন্তর্গত যে ভায়োলেন্স এই ছবি দেখায় তা উপভোগ করা যায়না, হয় সেই ভায়োলেন্স থেকে চোখ সরিয়ে নেওয়া যায় অথবা সেই ভায়োলেন্সের দৃশ্যে চোখে চোখ রেখে অবগত হওয়া যায় যে প্যারালালি আরও একটা সমাজ আমাদের সমাজের মধ্যেই এক্সিস্ট করে। UA সার্টিফিকেট পাওয়া ‘ভিসারানাই’ এর সাফাল্য ঠিক এখানেই, যে ভায়োলেন্সের দৃশ্য সে বাস্তবায়িত করেছে তার নির্মাণ, অভিনয় শৈলী সবকিছু দিয়ে তা আমাদেরকে এমন এক আয়নার সামনে এনে দাড় করায় যেই আয়নায় ভেসে ওঠে, রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং স্বীকৃত অত্যাচারের নমুনা যা আমাদের ইলুইশন থেকে বাস্তবায়নের পথে নিয়ে যায়। যা এক মুহূর্তে নস্যাৎ করে দেয় সিনেমা যে একটা মিথ এই আপ্তবাক্যকে।
রিয়েল লোকেশন, সম্পূর্ণ ন্যাচারাল লাইটে শুটিং করা ‘ভিসারানাই’ যে রিয়েলিটির সাথে আমাদের পরিচয় করায় তার সত্যতা নিয়ে যাচাই করবার আমাদের কোন প্রয়োজন হয়না। ছবির প্রথম হাফ হায়দ্রাবাদে এবং দ্বিতীয় হাফ এর বেশ কিছু অংশ চেন্নাইএর একটি মধ্যবৃত্ত কলোনিতে রাতের অন্ধকারে শুটিং করা হয়েছে। বাস্তব নির্মাণের ক্ষেত্রে তাই লোকেশন বাছাইও এই ছবির ক্ষেত্রে এক অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করেছে।

ভেট্রিমরনের প্রধান চরিত্ররা বরাবরই রুরাল তামিলিয়ান হয় এবং ক্ষমতার দ্বারা বরাবরই নির্যাতিত। তা ‘আদুকালাম’ হোক কি ‘ভিসারানাই’। কিন্তু ‘ভিসারানাই’ তে এসে পরিচালক ক্ষমতার আস্ফালন এর থেকে সেই আস্ফালনের নমুনা কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে সেই দৃশ্য তুলে এনেছে। সেই সঙ্গে যোগ হয়েছে জি.ভি. প্রকাশ কুমারের সঙ্গীত। যা বরাবর আমাদের এক কুৎসিত সত্যের সাথে পরিচয় করাবার জন্য ব্যবহৃত হতে থাকে।

আসলে পান্ডিদের যে সত্যিই ক্ষমতা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবে এবং এর বিরুদ্ধে যে কণ্ঠস্বর উঠবে তাকে দমিয়ে দেওয়া হবে, এ সত্য চিরকালীন। কিন্তু কিভাবে দমানো হবে? কিভাবে পান্ডিদের মতন মানুষকে ক্ষমতা অকথ্য অত্যাচার করবে এবং শেষে নিজের কলার বাঁচাতে তাদের মুখ বন্ধ করে দেওয়া হবে সেই বিবরণীর নামই ‘ভিসারানাই’। ৭২তম ভেনিস ইন্টারন্যাশানাল ফেস্টিভ্যালে ওরজোনাট্টি বিভাগে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশানাল ইটালিয়া পুরষ্কার যা এর মুকুটে আরও একটি পালক যোগ করেছে।


এছারাও উল্লেখযোগ্য একটি কথা যা হয়ত ছবির সাফ্যলের ও নির্মাণ কৌশলের ওপর অতটা গুরুত্বপূর্ণ নয় তা হল এই ছবির প্রযোজক অভিনেতা ধনুষ। যার প্রযোজনায় গত বছর নির্মিত হয়েছিল ‘কাকা মুট্টাই (Kaaka Muttai)’, যা গত বছর ভারত থেকে অস্কারে পাঠানোর ছবির দৌড়ে ছিল শেষ রাউন্ড অবধি। প্রথাগত মেইনস্ট্রীম ছবির বাইরে বেড়িয়ে ইন্ড্রাস্ট্রির মধ্যে থেকে অন্য ধারার ছবি এক অন্যতম উদাহরণ ছিল ‘কাকা মুট্টাই’ এবং এই বছর ‘ভিসারানাই’। আজ এই মনপলির জামানায় প্রযোজক ধনুষকে তাই এই ধরনের ছবি প্রযোজনা করার জন্য কুর্ণিশ না জানিয়ে উপায় নেই।।

ছবিঃ- ভিসারানাই (Visaranai)।
মূল গল্পঃ- এম. চন্দ্রন কুমার।
সিনেমাটোগ্রাফিঃ এস. রামালিঙ্গম।
এডিটরঃ- কিশোর. টি।
সঙ্গীতঃ- জি.ভি. প্রকাশ কুমার।
অভিনয়েঃ- দীনেশ রভি, আদুকালাম মুরুগাডোস, সামুথিরাকানি, আনন্দি, অজয় ঘোষ প্রমুখ।
চিত্রনাট্য ও পরিচালনাঃ- ভেট্রিমরন।

ছবি সৌজন্যেঃ- গুগল। 


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...