সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

কাশ্মীরঃ রাষ্ট্রের বন্দুক বনাম সাধারণ মানুষের জীবন

বছর ছয়েক আগের কথা, অক্টোবরের হয়ত কোন এক জ্যোৎস্না মাখা দিনে, বিকেলের ফুরফুরে হাওয়ার সাথে সামনের সুউচ্চ পাহাড়দের সাক্ষী রেখে ১৬ বছরের এক কিশোর বালক দাদা ও তার বন্ধুর সাথে মোটর সাইকেল সাওয়ারিতে বেরিয়েছিল, ঠিক তেমনই যেমন সে এই দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এখানে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠছিল রোজ রোজ, তার নিজের এলাকায়, তার নিজের জন্মস্থানে। কিন্তু সে বোধহয় জানত না বেশ কয়েকমাস ধরে রাষ্ট্রের নির্দেশে মিলিটারি সংগঠন একশোর ওপরে সাধারণ মানুষকে মেরে ফেলেছে। কারণ তাঁরা জানত না 'কাশ্মীরিদের মরবার জন্য কোন কারণ হয়না, বেঁচে থাকার জন্য রাষ্ট্রকে এক্সপ্লানেশন দিতে হয়।' মিলিটারি বাহিনী সেই তিন যুবকের বাইক থামিয়ে তাদের জন্য সিগেরেট আনার নির্দেশ দেয়, এনে দেওয়ার পর বিনা কারণে (যার ব্যাখা রাষ্ট্র কোনদিনই কোন ঘটনার প্রেক্ষিতে দিতে পারেনি) মারধর করে, বাইক ভেঙে দেয়। সেদিনের সেই ১৬ বছরের কিশোরটি ছিল 'বুরহান ওয়ানি'। আর তার সাথে ছিল তাঁর দাদা খালেদ ওয়ানি ও তাঁর এক বন্ধু। দাদা খালেদ ওয়ানিকে এরও বেশ কিছুদিন পর বুরহান দেখবে নিজের বাড়ির দুয়ার থেকে কফিন বন্দি হয়ে বেরোতে। শুধু খালেদকে নয় সে এই দীর্ঘ ছয় বছরে তাঁর ছয় জ্ঞাতি ভাইকে সে দেখেছে ঠিক একই রকম ভাবে। আর তারপর যেদিন সে কাশ্মীর ভ্যালির কোন এক ঘন কুয়াশা মাখা রাতে লম্বা লম্বা পাইন গাছের আড়ালে হারিয়ে গেল, হাতে বন্দুক তুলে নিল, অঘোষিত বিপ্লব জাড়ি করল সেদিন থেকে সে রাষ্ট্র সংজ্ঞায়িত 'সন্ত্রাসবাদী'। অথচ একজনও এই দীর্ঘ বছরগুলিতে দেখল না যে বুরহান ওয়ানি দেখে এসেছে যাদের হাতে বন্দুক ক্ষমতা তাদের হাতে, তাঁরা বিনা বাধায় ১৫২৩ জন সাধারণ মানুষকে হত্যা করতে পারে মণিপুরে, তাঁরা বিনা বাধায় সাধারণের থেকে তুলে এনে কোন মেয়েকে ধর্ষণ করতে পারে কারণ এগুলি রাষ্ট্র স্বীকৃত। বুরহান ওয়ানি শুধু চেয়েছিল রাষ্ট্রের নিরপত্তার নামে সাধারণ মানুষকে হত্যা বন্ধ হোক, তাঁর প্রতিবাদ ছিল সেই সমস্ত মানুষদের উদ্দেশ্যে যারা এই ধরনের ঘটনাকে প্ররোচনা দেয়। সে ঘোষণা করেছিল অমরনাথ তীর্থ যাত্রীদের সে কোন ক্ষতি করবে না কারণ সংবিধান আমাদের নিজ নিজ ধর্ম প্রতিপালনের স্বাধীনতা দিয়েছে, সে ঘোষণা করেছিল কাশ্মীরি পণ্ডিতরা যেন আবার ফিরে এসেে কাশ্মীরি মুসলমানদের সাথে বাস করা শুরু করে, সে বলেছিল সে সেইসব পুলিশদের হত্যা করবে না যারা তাদের কোন শাস্তি দেয়নি, তাঁর লড়াইটা তাদের বিরুদ্ধে যারা ইজরায়েলি কায়দায় কাশ্মীরে ক্ষমতা বজায় রাখার চেষ্টা করছে, সে কোনমতে আর একটা প্যালেস্টাইন হতে দেবে না।
২২ বছরের বুরহান ওয়ানিকে হিজাব-উল-মুজাহাদিনের সংগঠক হওয়ার অপরাধে হত্যা করেছে। ফেক এনকাউন্টার। যার যুক্তি নিজের প্রাণ বাঁচাতে হত্যা করা। আর বুরহান ওয়ানির শেষ যাত্রায় কুড়ি হাজারেরও বেশি মানুষ এসেছে, রাগ তাদের অন্তরে অন্তরে, ৯০ সাল থেকে শুরু হওয়া কাশ্মীরের গনহত্যা এখনও বহমান। রাষ্ট্র এদের ওপরও ঝাঁপিয়ে পরেছে। ৩০ জনের মত সাধারণ মানুষ মারা গেছে, আহত অসংখ্য। তাদের অপরাধ তাঁরা রাষ্ট্রের স্বঘোষিত ক্ষমতার বিপক্ষে প্রতিবাদে নেমেছিল, তাঁরা তাদের সেনাপতির মৃত্যুতে শোকাহত হয়ে বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ মনে রেখে রাস্তায় নেমেছিল। তাহলে রাষ্ট্রের তকমা অনুযায়ী এই ২০ হাজার মানুষও সন্ত্রাসবাদী? আরও একটা জেনোসাইড করে কি এদেরকেও রাষ্ট্র তাঁর ক্ষমতা প্রদর্শন করছে? কিন্তু এদেরকে আজ লড়াই করতে বাধ্য করেছে কে? বুরহান ওয়ানিকে অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বাধ্য করেছে কে? বন্দুক তুলে নিতে শিখিয়েছে কে? রাষ্ট্র নিজে। তাই এরা যদি এক একটা সন্ত্রাসবাদী হয়, বুরহান ওয়ানিকে মেরে ফেলা যদি সন্ত্রাসবাদী হামলা হয়, তাহলে রাষ্ট্রের ক্ষমতার পৃষ্ঠপোষকরাও এক একজন সন্ত্রাসবাদী। কিন্তু আমরা সকলেই তো স্বপ্ন দেখি একটা সুন্দর সকালের একটা সুন্দর দিনের যে দিন রাষ্ট্র তার জনগণকে শুধুমাত্র জীবনে বেঁচে থাকার প্রয়োজনীয় পথ গুলোতে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে, সমস্ত দিক থেকে নিরপত্তা দেবে, নিরপত্তার নামে কখনও তাদের কাছ থেকে জীবন ধারনের প্রয়োজনীয় পথ গুলো কেড়ে নেবে না, বাধ্য করবে না হত্যার যজ্ঞলীলায় সামিল হতে, বাধ্য করবে না হাতে বন্দুক তুলে নিতে, শালবোনি, লালগড়, বস্তারে শান্তি ফিরিয়ে আনবে, মনিপুর মিজোরাম আর কখনও কোন মনোরমাকে দেখবে না, আর কখনও শর্মিলা চানুকে অনাহারে থাকতে হবেনা, রাষ্ট্রের বিরোধিতা করলেই আর কেউ কখনও দেশদ্রোহী হয়ে যাবেনা। ঠিক এরকম দিনের সন্ধানেই তো আমরা আছি, বেঁচে থাকার সার্থকতা এই স্বপ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। 
" You may say I'm a dreamer But I'm not the only one I hope some day you'll join us And the world will be as one" ----- John Lennon.

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...