মৃত্যু সবসময়ই দুঃখজনক, তা সে যে কারোরই হোক। সেই মৃত্যু আরও বেদনাদায়ক যা অসময়ে হয়। উরি সেনা ছাউনিতে ১৭ জন ভারতীয় সেনার সন্ত্রাসবাদী হামলায় মৃত্যু আরও একবার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের, সীমান্ত সুরক্ষা করতে গিয়ে আমাদের নিরাপদ জীবন প্রদানের লক্ষ্যে যে উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাও পদে পদে বিপদের সম্মুখ হয়ে পরে। কিন্তু নিরাপরাধ সৈন্য মৃত্যুর দায় কাদের?
রাষ্ট্রযন্ত্র তাঁর সেনাকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ। রাষ্ট্রনীতি দিনের পর দিন ধরে এক পচা শামুকের মতন হয়ে গেছে যাতে পা দিলেই পা কাটে। যে সদিচ্ছা নিয়ে ’৪৭ এর দেশ ভাগের পর কাশ্মীরে সেনাবাহিনী পাঠানো হয়েছিল সেই সদিচ্ছা যে আসলে অসদ উপায়ে কাশ্মীরে হস্তক্ষেপ ছিল তা প্রতি দশক প্রমাণ দিয়েছে। ১৭ জন সেনার মৃত্যু ঠিক যতটা বেদনাদায়ক ঠিক ততটাই বেদনাদায়ক শেষ তিনমাসে আশির উপরে সাধারন কাশ্মীরি মানুষের মৃত্যু, ১১০০০ এর উপরে আহত হয়ে পরা এবং কয়েক হাজারের ওপরে মানুষের দৃষ্টিশক্তি হারানো। এই সবকিছুর দায় যদি নিতেই হয় তাহলে তা সম্পূর্ণ আমাদের। আমরাই প্রতি পাঁচ বছর অন্তর এমন সরকার গঠন করি যাদের রাষ্ট্রনীতি বলপূর্বক কাশ্মীর অধিগ্রহণ করতে চায় কিন্তু তাদের মৌলিক অধিকার টুকু প্রদানে ব্যর্থ। সেনা পাঠিয়ে নিজের কব্জায় রাখতে চায় কিন্তু ঝিলমের জলে এসে মেশা রক্তের
দায় নিতে চায়না। মানুষের মৌলিক অধিকারটুকু প্রদানের মাধ্যমে তাদেরকে দেশের গৌরবান্বিত নাগরিক হওয়ার সুযোগ দেয়না। রাষ্ট্রযন্ত্র এই সকল ক্ষেত্রে বিকল। তাঁর চেয়েও বিকলাঙ্গ তাদের মস্তিষ্ক যারা সামাজিক ব্যাধিকে প্রশ্রয় দেয়। নিরপরাধ মানুষের মৃত্যুতে আনন্দ উৎসব পালন করে এবং এই ধরনের সকল অন্যায় কে অস্বীকার করে। তাদের বোকা মস্তিস্কে এই সামান্যতম ব্যাপারটা ঢোকেনা যে পৃথিবীর ইতিহাসে কোনদিনও একপক্ষ দশকের পর দশক, শতকের পর শতক ধরে অত্যাচার করে যাবে আর অপরপক্ষ সেই অত্যাচার সহ্য করবে এমনটা হয়নি। মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট সরকারেরও পতন ঘটেছিল। ব্রিটিশরাও ভারত ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল। প্রতিবাদ, বিপ্লব এই শব্দ গুলোর অস্তিত্ব যে এখনও আছে তাঁরা হয়ত ভুলে গেছে। বুলেটে ঝাঁঝরা হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও কেউ এগিয়ে এসে ইট ছুঁড়বে না। যখন তাঁর জীবন ধারনের নুন্যতম অধিকারটুকু সে পায়না, জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয়টুকু রাষ্ট্র যখন তাঁকে দিতে নস্যাৎ করে তখন ঘরের বাইরে আইন অমান্য করে বেড়িয়ে আসা ছাড়া আর কোন উপায় থাকে না। স্বাধীনতা পূর্ব ভারতে আলিপুর কোর্ট মামলা, চৌরিচৌরার ঘটনা, কাকরি ট্রেন ডাকাতি, চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন প্রতিটাই আইন অমান্য করে পথ বেছে নেওয়া। কারণ নিজেদের অধিকারটুকু বুঝে নেওয়ার প্রয়োজন ছিল, অত্যাচার থেকে মুক্ত হওয়ার দরকার ছিল। নরমপন্থী এবং চরমপন্থীদের উত্থানও এই অধিকার বাঁচাও আন্দোলনের পথ বেঁচে নেওয়া থেকেই।
কিন্তু যারা হিটলারের শাসনকে আহ্বান করে, যারা কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প গড়ার কথা বলে, আদতে তাঁরা অ্যানা ফ্রাঙ্কের মৃত্যুকে অস্বীকার করে, ‘ডাইরি অফ এ ইয়ং গার্ল’কে নস্যাৎ করে, হাজারো ইহুদি নিধনকে অনুমোদন দেয়। কিন্তু এইসব বোকা মস্তিষ্ক জানেনা হিটলারকেও আত্মহত্যা করতে হয়েছিল, ‘ডাইরি অফ এ ইয়ং গার্ল’ এই পৃথিবীর অন্যতম সর্বাধিক পঠিত বই, অ্যানা ফ্রাঙ্ক এই পৃথিবীর মানুষের কাছে এক অন্যতম প্রিয় চরিত্র। আমার দুঃখ হয় নিজের প্রতি এই ভেবে যে এই ধরনের মানুষ আমার পরিচিত। যারা ধর্মের ভিত্তিতে মানুষকে আলাদা করে, যারা ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে, যারা এই দেশে জাতপাতের নিমিত্তে মানুষকে নিচুতলার তকমা দেয়, তাদেরকে বিনা অপরাধে নিধন করার পক্ষে সায় দেয়। আর এদেরকেই এখন রাষ্ট্র বীর বিক্রমী তকমা দেয়, যারা মানবিকতা হারিয়েছে, যারা মনুষ্যত্বের ধর্মকে চিরতরে বিসর্জন দিয়েছে।
যেহেতু প্রতিটা মৃত্যুই সমান দুঃখজনক, তা সে ১৭ জন ভারতীয় সেনার হোক, রোহিত ভেমুলার হোক, বুরহান ওয়ানির হোক, ১১ বছরের নিষ্পাপ কাশ্মীরি বালকের হোক কি মানসিক বিকলাঙ্গ কাশ্মীরি সহ নাগরিকের হোক বা কলকাতার ফুটপাথে থাকা ১২ বছরের কিশোরীকে ধর্ষণ এবং হত্যা হোক, বস্তারে আদিবাসীদের হোক, গুজরাতে দলিতদের হোক, জাদুগোরায় পারমাণবিক বিকিরণে আদিবাসীদের হোক----- প্রতিটা মৃত্যুই সমান দুঃখজনক। প্রতিটা মৃত্যুই সমান বেদনাদায়ক। আর যারা মৃত্যুকে নস্যাৎ করে, মৃত্যু উপলক্ষে জয়োল্লাস করে তাদের মত ধর্মীয় কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষদের জন্য আমরা না হয় আরও বেশী ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তুলি, যাতে তাদের মৃত্যুতে অন্তত কেউ জয়োল্লাস না করে, তাদের মৃত্যুকে কেউ নস্যাৎ না করে, যাতে তাদের মৃত্যুও সব মৃত্যুর মত সমান দুঃখজনক হয়, সমান বেদনাদায়ক হয়। কারণ মানুষ মরণশীল, ইহা সত্য।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।