ধরা যাক কাব্যিক ছন্দে যদি কেউ
বলে ওঠে-
‘পৃথিবী থেকে সমস্ত ঘৃণা সরিয়ে
নিতে পারি
যদি তোমাকে পাই সারা জীবন পাশে’।
যদি তোমাকে পাই সারা জীবন পাশে’।
ছন্দ মিলল না তো? মেলে না। অনেক সময়ই অনেক কিছুর ছন্দ মেলে না।
সুপ্রিয়রও তাই। জীবনে ছন্দপতন লেগেই আছে। তবে সে ছন্দ প্রণয় ঘটিত ছন্দ। নয় নয় করে
এযাবৎ কাল অবধি সুপ্রিয় গোটা চার পাঁচেক প্রেম করে ফেলেছে। প্রেমে পরা সুপ্রিয়র
কাছে নতুন কিছু নয়। এক প্রেম ভাঙে তো আর একটা নতুন প্রেম শুরু হয়। অতএব বলা যেতেই
পারে সুপ্রিয়র জীবন প্রেমময় জীবন।
সুপ্রিয় আর পাঁচজনের মত সেই যুবক যে মনে করে যৌবনে শান্তি বজায় রাখতে
প্রেম করতে হয় নইলে আফসোস করতে হয়। জীবনে দুঃখ কষ্ট ভাগ করে নেওয়ার মতন মানুষ যদি
নাই থেকে তবে নাকি সে জীবন বৃথা। তাই সকলকেই সে একই পরামর্শ দেয়- ‘প্রেম কর, প্রেম
কর’। কিন্তু সুপ্রিয় যখন স্কুলে পড়ত তখন সে বুক ফুলিয়ে বলত ‘আমি জীবনে প্রেম করব
না’। কিন্তু আফসোস পরিবর্তনের অনেক আগেই সুপ্রিয়র চিন্তা ধারায় পরিবর্তন হওয়ায় সে
দর্প চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। তা নিয়ে বন্ধুমহলে হাসিঠাট্টা কম হয়নি। এখনও মাঝে মধ্যেই
হয়।
কিন্তু সেসব কোথা থাক। বর্তমানে ফেরা যাক। সুপ্রিয় এখন প্রতিষ্ঠিত। একটি
মধ্যমানের বেসরকারী সংস্থার কর্মী। কম্পিউটারের ভাষায় বললে সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার।
নিয়মিত সকাল ৮টার ট্রেনে অফিস যায় আবার রাত ৮টার ট্রেনে ফিরে আসে। শনিবার করে
বিয়ার বা হুইস্কির আসরে যোগ দেয়। রবিবার সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠে, বাজারে যায়,
মাংস কেনে, তারপর বাড়ি ফিরে এসে দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে কোন কোন রবিবার নিজের
প্রেয়সীর সাথে ঘুরতে যায়। একটু উঁচু দরের ভাষায় বললে ‘কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড’ করতে
যায়। একেবারে পাক্কা উচ্চবিত্ত বাঙালী হওয়ার লক্ষণ বেশ প্রস্ফুটিত।
সুপ্রিয়র এই প্রেমটা হয়েছে বেশিদিন হয়নি। নতুন বলে আদিখ্যেতাটা একটু
বেশি। এখন রুটিনে কিছু পরিবর্তন হয়েছে। এখন রাতে বাড়ি ফেরবার আগে নিজের প্রেয়সীর
সাথে ঘন্টাখানেক সময় কাটিয়ে ফেরে। আজও সেই পথেই যাচ্ছে। কাজলকে বিদায় জানিয়ে বড়
রাস্তা থেকে ডানদিকে ঘুরে কিছুদূর যাবার পরই আবার বৃষ্টি নেমে গেল। সাইকেল থেকে
নেমে ব্যাগ থেকে ছাতা বের করে আবার রওনা দেবে সেই মুহূর্তেই ফোন বেজে উঠল। বেজে
ওঠা মানে আলো জ্বলে উঠল। যেহেতু ফোনটা বেশিরভাগ সময়ই হয় হাতের মুঠোয় নয় তো হাতের
সামনেই থাকে তাই ফোনটা দীর্ঘদিন ধরে নিস্তব্ধই রয়েছে। কারোর ফোন এলে শুধুমাত্র আলো
জ্বলে ওঠে। এখনও তাই হয়েছিল। নেহাত সাইকেলে উঠে রওনা হওয়ার আগে বৃষ্টির হাত থেকে
বাঁচাবার জন্য ফোনটা এক পকেট থেকে আরেক পকেটে স্থানান্তরিত করবার সময়ই আলো জ্বলে
উঠেছিল। তাই বুঝতে পেরেছিল। প্রেয়সীর ফোন।
- হ্যালো...
- হ্যাঁ বলো (সাধারনত
ফোনে কথা বলার যে পরিমান শব্দের তীক্ষ্ণতা থাকে তার চেয়ে কম ডেসিবেলে)
- তুমি কোথায়?
- এই তো আসছি?
- বৃষ্টি শুরু হল তো
আবার।
- হ্যাঁ তাই তো দেখছি। আর
সময় পেল না এখনই শুরু হতে হল।
- ভিজে ভিজে আসছ?
- ভিজে কেন আসব? ছাতা আছে
তো।
- ওহ আচ্ছা ঠিক আছে আস।
- হ্যালো.........
হ্যালো......
- বল-
- বলছি শোন না তুমি ছাতা
নিয়ে বের হয়েও না।
- সেকি কেন?
- দুজনে এক ছাতা শেয়ার
করব।
- আচ্ছা তাই ! তারপর আমায়
বাড়ি পৌঁছে দেবে কে শুনি? তুমি তো গলির সামনে অবধি এসেই চলে যাও।
- আরে আজকে পুরোটা এগিয়ে
দেব।
- না না, কেউ দেখে ফেলবে।
- আরে কেউ দেখবে না। শোন
শোন আমি আর কয়েক মিনিটের মধ্যেই চলে আসছি, কাছাকাছিই আছি, তুমি সামনের দিকে এগিয়ে
আস।
- ঠিক আছে আসছি।
সুপ্রিয়র প্রেয়সীর আর ছাতা খোলা হয়নি। কারন আজ দুজনে হাঁটবার বদলে সাইকেলে
চড়ে ভ্রমণে বেরিয়েছে। তারা ইচ্ছে করেই একটি ছাতার তলায় আসার জন্য আজ সাইকেলে চড়ে বেরিয়েছে
কিনা তা বোঝা দায়। হয়ত এমনও হতে পারে বৃষ্টি হচ্ছে, তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে হবে, তাই
ওদের তাড়া আছে, সেই কারনেই হয়ত আজ সাইকেল ভ্রমন।
দুজনে অর্ধভেজা অবস্থায় যখন কলোনির সামনের রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল তখন
ওদের উল্টো দিক থেকে আসছিল অতনু। সুপ্রিয় ছাতার তলায় প্রেয়সীর সাথে এত কথা বলায়
ব্যস্ত ছিল যে সে অতনু কে লক্ষ্য করেনি। কিন্তু অতনু দেখেছিল। ডাকে নি। ডাকলে ও
নিজেই অস্বস্তিতে পড়ত।
ওদের সামনে দিয়ে অতনু চলে যাবার পর ওরা খানিকটা এগিয়ে এসে কলোনির মাঠের
কাছে হঠাৎ দাড়িয়ে পরে। সুপ্রিয়র প্রেয়সী কিছু বুঝবার আগেই সুপ্রিয় পাশের আম গাছটার
তলায় গিয়ে দাঁড়ায় এবং ওর প্রেয়সীকে হাত নেড়ে ইশারা করে ডাকতে থাকে। ইশারা করবার
পরও যখন প্রেয়সী ছাতা হাতে সাইকেলের সামনেই দাড়িয়ে আছে তখন একটু জোড় গলায় হাঁক
দিল-
-
কি হল? এদিকে
এস। ভিজে যাচ্ছি যে।
প্রেয়সী তাড়াতাড়ি গাছের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
-
কি হল এখানে
দাড়িয়ে পড়লে? কি হয়েছে?
-
কিছু না।
বৃষ্টিটা একটু জোড়ে নামল তো তাই।
-
ওহ!......
আমার কাছে ছাতা আছে তো চল তাহলে এবারে হেঁটে হেঁটে যাই।
-
আরে যাব।
দাড়াও না একটু এখানে।
-
আরে এই
অন্ধকারে এখানে কেন? কেউ দেখে টেখে নিলে............
সুপ্রিয় এরপর আর কিছু বলতে দেয়নি। ডানদিকের বাহু প্রশস্ত করে ওর
প্রেয়সীর কাঁধের উপর দিয়ে চালান করে তাকে নিজের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ করে নিয়েছে। এতে
ওর প্রেয়সীর কি প্রতিক্রিয়া হয়েছে তা সুপ্রিয় অন্ধকারে বুঝতে পারেনি। হয়ত এমনও হতে
পারে ও বোঝবার কোন চেষ্টাই করেনি। কিছুক্ষন চুপ করে থাকার পর অধিকাংশ বাঙালী
প্রেমিক তার প্রেমিকার কাছে প্রেম নিবেদন করবার সময় যে কথাগুলি বলে থাকে সুপ্রিয়ও
সেটারই পুনরাবৃত্তি করল।
-
তোমায় না আজ
দারুন লাগছে।
-
ওহ তাই বুঝি?
-
হ্যাঁ সত্যি।
তোমার দিব্যি।
-
আমি এমনিতেই
সুন্দর। তোমার বলার আগেই আমি জানি।
সুপ্রিয়ও হাসি হাসি মুখ নিয়ে ওর প্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে রইল। কিন্তু মুখ
ফুটে বলতে পারছিল না ওর বুকের ভিতর যে তুফান উঠছে তার কথা। আরও কয়েক মুহুর্ত
নিস্তব্ধতার পর......
-
ওয়েদারটা কি
দারুণ না আজকে!
-
দারুণ না
ছাতা। প্যাচপ্যাচে বৃষ্টি। আমার আজ একটুও বেরোতে ইচ্ছে করছিলনা।
-
ওহ আচ্ছা তাই
নাকি? তা বেরোলে কেন?
-
না বেরোলে তো
তুমি আবার............
-
আমি আবার কি?
-
কিছু না।
প্রেয়সী মুখ ঘুরিয়ে নিল। সুপ্রিয় দুহাত দিয়ে ওর গাল দুটো একেবারে নিজের
মুখের সামনে নিয়ে এল। দুজনের নিঃশ্বাসের গরম বাতাস একে অপরের মুখে এসে লাগছিল। এর
ঠিক পরমুহুর্তেই দুই যুবক যুবতী নিজেদের ওষ্ঠদ্বয়কে একে অপরের সান্নিধ্যে এনে যে
অপার সুখ অনুভব করছিল তা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ নাকি শারীরক চাহিদার প্রভাব তা ওরা
দুজনে কেউই হলফ করে বলতে পারবে না। পারবে না কারন আজও ভালোবাসা আর চাহিদাটা অনেকের
কাছেই একে অপরের পরিপূরক। তাই এক্ষেত্রে শুধু এইটুকুই বলা যায় যে ভালোবাসা পাওয়ার
জন্য আজও অনেকেই বৃষ্টির সময় একটা ছাতাতেই কাটিয়ে দেয় সে ভালোবাসা যেন ওদের কপালে
না জোটে। ঈশ্বর যেন সে বিষয়ে সজাগ থাকেন।
ঠিক যেই মুহুর্তে ওরা দুজন যখন ঘনিষ্ঠ হয়েছিল সেই সময়ই হাসপাতালের
দোতলায় মহিলা ওয়ার্ডে এক বয়স্ক বিধবা মহিলা বারবার ফোন করে করে তার ছেলের কাছে
থেকে কোন উত্তর না পেয়ে কপাল ভাঁজ করে চিন্তার বলিরেখা প্রকট করে ভাবছিল তার ছেলে
ফিরল কিনা?
অতনু সুপ্রিয়দের পাশ দিয়ে চলে আসার আরও কিছুক্ষন পর সে যখন চৌরাস্তার
কাছে এসে পৌঁছালো তখন তার সাথে কাজলের দেখা হল। কাজল বড় রাস্তা থেকে বাঁদিকের
অন্ধকার রাস্তা দিয়ে আসবার সময় কিছুদূর এসেই তার মনে পড়েছিল আগামীকালের পরীক্ষার
জন্য অ্যাডমিট কার্ড প্রিন্ট করা হয়নি। তাই আবার ষ্টেশন রোডে গিয়েছিল প্রিন্ট আউট
নিতে। সেটা নিয়ে ফেরবার পথেই দেখা হয় অতনুর সাথে।
-
কিরে কাজের
ওখান থেকে?
-
হ্যাঁ রে।
তুই?
-
এই তো পড়াতে
গিয়েছিলাম।
-
ওহ!
কাজল যে পার্টটাইম কাজটা করে সেটা একমাত্র অতনুই জানে। বাকি বন্ধুরা
আন্দাজ করলেও সঠিকটা কেউই জানে না। অতনু সবে ভাবছিল বাড়ির দিকে রওনা দেবে কিন্তু
হঠাৎ কাজল জিজ্ঞেস করে উঠল-
-
হ্যাঁরে সুপ্রিয়
এখন আবার নতুন কারোর সাথে প্রেম করছে নাকি?
-
তাই নাকি? আমি
তো কিছু জানি না।
-
হ্যাঁ। আমার
সাথে দেখা হয়েছিল একটু আগে। বলল দেখা করতে যাচ্ছি। জিজ্ঞেস করলাম কার সাথে বলল না
কিছু।
-
ওহ তাই। আমি
তো কিছুই জানি না রে।
চৌরাস্তা থেকে বাদিকে গেলে কাজলের বাড়ি আর সোজা যে রাস্তাটা চলে গেছে
সেটা দিয়ে অতনুর বাড়ি। আরও কিছুক্ষন কথা বলার পর দুজনেই বাড়ির দিকে রওনা দিল।
কিন্তু অতনু একবারও ভুল করে বলল না যে সে একটু আগে সুপ্রিয়কে ওর প্রেয়সীর সাথে
দেখেছে। অতনু জানে এসব বলার মধ্যে বা না বলার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। কারোর
ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কৌতূহল হওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। ব্যক্তিগত জীবনের ওপর কৌতূহল
যদি থাকেতেই হয় তাহলে সেই ধরনের মানুষদের ওপর থাকবে যাদের ব্যক্তিগত জীবন বলতে
তাদের কাছে নিজের অতি সঙ্কীর্ণ স্বার্থ ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি। ঠিক সেই কারনেই
শুধুমাত্র মানুষকে জানার জন্য তারা কিভাবে আছে তা পর্যবেক্ষণ করবার জন্য নিজের
সম্পর্কের তোয়াক্কা না করে অনায়াসেই নিজের প্রেমিকার থেকে বহুদূরে দীর্ঘদিনের
ছুটিতে বেরিয়ে যাওয়ার সময় আর্নেস্তো চে গেভেরা তার বাবাকে নির্বিদ্ধায় বলতে
পেরেছিল-
‘সে যদি আমাকে ভালোবাসে তাহলে নিশ্চয়ই অপেক্ষা করবে’।
কারণ তার কাছে ভালোবাসার অর্থ ছিল বিশ্বাস। অতনু সারা রাস্তা শুধু এটাই
ভাবতে ভাবতে গেল যে বৃহত্তর স্বার্থের জন্য নিজের জীবনের ক্ষুদ্রতর স্বার্থ ত্যাগ
করাটাই জীবনের প্রকৃত আদর্শ। (ক্রমশ)
ছবি সৌজন্যেঃ গুগল ইমেজ।
ছবি সৌজন্যেঃ গুগল ইমেজ।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।