বড়দিনের কয়েকদিন আগে, মণিপুরের কাংপোকপি জেলা যা প্রধানত ক্রিশ্চান কুকি-জো সম্প্রদায়ের মানুষদের আবাসভূমি, সেখানকার একটি গ্রামে একটি টিনের ছাদ দিয়ে ঘেরা বাঙ্কারের ভিতর বন্দুক ও গুলি ভর্তি ব্যাগ রাখতে ব্যস্ত ১৯ বছর বয়সী চনমিনলাল কিপগেন এবং ২৬ বছর বয়সী পাওলাল কিপগেন আশ্চর্যজনক ভাবে বড়দিনের উৎসবের আনন্দে না মেতে খুবই শান্ত ছিল। তারা বন্দুক ও গুলির ব্যবস্থা করছিল কারণ পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে লুকিয়ে থাকা মেইতেই সম্প্রদায়ের সশস্ত্র যোদ্ধাদের বিরুদ্ধে যাতে লড়াই করতে পারে। তারা নিজেদেরকে গ্রামের স্বেচ্ছাসেবক এবং বেসামরিক নাগরিক বলে আখ্যা দিয়েছিল কারণ তারা তাদের ঘরবাড়ি রক্ষার জন্য অস্ত্র তুলে নিয়েছিল।
মণিপুরের রাজধানী ইম্ফল এর থেকে অনতিদুরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই সম্প্রদায়ের মানুষরাও নভেম্বরে শুরুতে তাদের সবচেয়ে প্রিয় উৎসব নিঙ্গোল চকোবারের সময়ও একইরকমভাবে নীরব উদযাপন করেছিল।
গত ১১ মাস ধরে, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুরের দুটি সম্প্রদায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বাধীন ফেডারেল সরকারের নজরদারির অধীনে ২১ শতকে দেশের দীর্ঘতম চলমান জাতিগত সংঘাতের মধ্যে আটকে রয়েছে।
এই দ্বন্দ্বকে প্রায়শই হিন্দু মেইতেই এবং খ্রিস্টান কুকি-জো সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি সংগ্রাম হিসাবে অতিরঞ্জিত করা হয়, যা ভারতের বিভিন্ন অংশে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর হামলার ক্ষেত্রে দেখা ধর্মীয় মেরুকরণকে প্রতিফলিত করে। কুকি-জো সম্প্রদায়গুলি প্রায় সম্পূর্ণরূপে খ্রিস্টান হলেও, মেইতেই সম্প্রদায় প্রধানত হিন্দুধর্মের একটি সমন্বিত রূপ। তারা তাদের নিজস্ব আদি বিশ্বাস ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যাকে সনামাহিজম বলা হয়। অল্প সংখ্যক মেইতেই মানুষ খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মও অনুসরণ করে।
কিন্তু মণিপুরে অসম রাইফেলসের কর্মকর্তাদের দ্বারা প্রস্তুত একটি মূল্যায়ন মণিপুরের সংঘাতের কারণগুলির একটি ভিন্ন সেটকে তুলে ধরেছে। অসম রাইফেলস হল যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকারের আধাসামরিক বাহিনী, যাদের এই রাজ্যে এক দীর্ঘ এবং বিতর্কিত ইতিহাস রয়েছে। এটি দেশের প্রাচীনতম আধাসামরিক বাহিনী এবং সেনাবাহিনীর পাশাপাশি উত্তর-পূর্বে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখার দায়িত্ব বহন করে।
রিপোর্টার্স কালেক্টিভ (টিআরসি) ২০২৩ সালের শেষের দিকে এই মূল্যায়নটি পর্যালোচনা করে। যে আধিকারিকরা তাদের উপস্থাপনাটি দেখিয়েছিলেন তারা বেনামে থাকতে চেয়েছিলেন।
এই উপস্থাপনায় বলা হয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সদস্য মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেন সিংয়ের নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকার এবং তাঁর "রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা"-ই এই সংঘাতের অন্যতম কারণ।
এই উপস্থাপনাটি তাৎপর্যপূর্ণ কারণ প্রধানমন্ত্রী আগামীর সাধারণ নির্বাচনের আগে জোর দিয়েছিলেন যে কেন্দ্রীয় সরকারের সময়োপযোগী হস্তক্ষেপের ফলে মণিপুরে "পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি" হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই দ্বন্দ্ব নিয়ে যে কয়েকবার কথা বলেছেন তার মধ্যে এটি একটি। এদিকে, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুখ্যমন্ত্রীর শান্তি আনার ক্ষমতার উপর আস্থা রেখেছেন, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। এখানে আগামী ১৯ এপ্রিল এবং ২৬ শে এপ্রিল আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের ভোট।
অসম রাইফেলসের মূল্যায়নে এই সংঘর্ষের যে কারণগুলিকে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে সেগুলিকে সংঘাতের সময় আধিকারিকরা নির্ধারণ করেছিলেন। এতে প্রতিবেশী মায়ানমার থেকে আসা "অবৈধ অভিবাসীদের" প্রভাব, অভিবাসন হ্রাস করার জন্য নাগরিকদের একটি জাতীয় নিবন্ধনের দাবি এবং কুকিল্যান্ডের চাহিদাকে তুলে ধরা হয়েছে।
কুকিল্যান্ড একটি পৃথক প্রশাসনিক ইউনিট, যাকে সশস্ত্র কুকি নেতৃত্ব মণিপুর থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চায়। এই জাতিগত সংঘাতের সময় কুকিল্যান্ডের চাহিদা পুনরুজ্জীবিত হয়েছে।
উপস্থাপনাটিতে জোর দিয়ে বলা হয়েছে যে মেইতেই সম্প্রদায়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি মানুষকে অস্ত্র দিয়ে সজ্জিত করছে এবং কুকি সম্প্রদায়ের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে নিজেদের প্রচার করেছে। এই সমস্ত কিছু উত্তেজনাকে তীব্র করেছে এবং উভয় সম্প্রদায়ের নেতারাই এই দ্বন্দ্বকে সাধারণ নাগরিক হিসাবে নিজেকে বাঁচাবার তাগিদে অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার দ্বন্দ্ব হিসেবে প্রচার করেছে।
এই সংঘাতের তাৎক্ষণিক সূত্রপাত ছিল যখন প্রভাবশালী মেইতেই সম্প্রদায় তফসিলি উপজাতির মর্যাদার দাবি করে, যা তাদের সরকারি চাকরি এবং কলেজে ভর্তির জন্য কোটা প্রদান করবে। কুকি-জো সম্প্রদায় সহ অন্যান্য উপজাতি গোষ্ঠীগুলি এর বিরোধিতা করেছিল।
কিন্তু উপস্থাপনাটিতে অসম রাইফেলসের আধিকারিকরা মুখ্যমন্ত্রীর নীতির দিকে ইঙ্গিত করেছিলেন, তাঁরা বলেছিলেন যে তাঁরা বিশ্বাস করেন মুখ্যমন্ত্রীর নীতির জন্যই সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা গড়ে উঠেছে। সংঘর্ষকে উস্কে দেওয়ার জন্য অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে "মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ" এবং "সোশাল মিডিয়ার কণ্ঠস্বরের মতবিরোধ" নিয়ে সিংয়ের "কঠোর অবস্থান" উল্লেখ করা হয়েছে।
উপস্থাপনাটিতে সিংকে মণিপুরে মাদকদ্রব্য উৎপাদন, ব্যবসা এবং বিক্রি বন্ধ করার জন্য রাজ্যে প্রচার চালানোর সময় সাম্প্রদায়িক বিভাজন তৈরি করার জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছিল। মায়ানমারের সীমান্তবর্তী রাজ্যের পার্বত্য অঞ্চলে উৎপাদিত পপি চাষের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর জোরালো অভিযানের ফলে এটা নিশ্চিত হয় যে তিনি কুকিদের লক্ষ্য করে আক্রমণ করছেন তার এই অভিযানে।
উপস্থাপনাটিতে হিংসার জন্য "রাষ্ট্রীয় বাহিনী 'নীরব সমর্থন" এবং "আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থার বিচ্ছিন্নকরণ"-এর কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
উপস্থাপনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, দ্বন্দ্বের আরেকটি কারণ হল "মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ"। এখানে ১৮ শতকে হিন্দুধর্মের আবির্ভাব এবং পরে ১৯৪৯ সালে মণিপুরকে ভারতে একীভূত করার আগে মেইতেই সম্প্রদায়ের দীর্ঘ ইতিহাসকে পুনর্জাগরণবাদ বোঝায়। এই অভিযান ১৯৩০-এর দশকে সনামাহবাদের পুনরুজ্জীবনের দিকে পরিচালিত করে এবং পরবর্তীকালে সশস্ত্র আন্দোলনকে উজ্জীবিত করে।
উপস্থাপনায় দুই মেইতেই সংগঠন মেইতেই লিপুন এবং আরামবাই তেংগোলকে সংঘাতের জন্য অভিযুক্ত করা হয়েছে।
২০২০ সালে মণিপুরের নামমাত্র রাজা এবং বিজেপি সাংসদ লেইশেম্বা সানাজাওবার তত্ত্বাবধানে আরামবাই তেংগোল গঠিত হয়েছিল।
তেংগোল প্রাথমিকভাবে সানামাহি সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবনের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এমন একটি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসাবে গঠিত হয়েছিল এবং পরে অস্ত্র গ্রহণ করেছিল। গত বছরের এপ্রিলে এটি খ্যাতি অর্জন করেছিল যখন এটি একটি মেইতেই খ্রিস্টান পাস্তুরের বাড়ি ভাঙচুর করে কারণ তিনি সানামাহিজম বিশ্বাসকে অপমান করেছিলেন।
আরামবাই তেংগোল পরিচালনা করেছেন টাইসন নগংবাম, যিনি "কোরুঙ্গানবা খুমান" ছদ্মনামে ব্যবহার করেন। (কোরুঙ্গানবা একটি সাধারণ মেইতেই নাম যার অর্থ "সূর্যালোক" এবং খুমান একটি বংশের নাম।)
জানুয়ারিতে, শক্তি প্রদর্শনের জন্য আরামবাই তেংগোল মণিপুরের বিধানসভার 37 জন সদস্য এবং রাজ্যের দুইজন সংসদ সদস্যকে ইম্ফলের কেন্দ্রস্থলে মেইতেই রাজাদের প্রাসাদ কাংলা দুর্গে একটি বৈঠকের জন্য ডেকে পাঠান, যার মধ্যে ছিলেন বিদেশ ও শিক্ষা বিষয়ক কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী আর কে রঞ্জন সিং। এখানে মেইতেই সম্প্রদায়ের আইন প্রণেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
নগাংবাম জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন এর দাবী করে। যার মাধ্যমে ভারত সরকার অনিবন্ধিত অভিবাসীদের সনাক্ত করবে এবং বিতাড়িত করবে।
দলটি কুকি-জো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলির সঙ্গে একটি শান্তি চুক্তি-বাতিল, মায়ানমার থেকে আগতদের প্রতিবেশী রাজ্য মিজোরামে শরণার্থী হিসেবে স্থানান্তর, ভারত-মায়ানমার সীমান্তে সীমানা বেড়া দেওয়া ও আসাম রাইফেলসকে প্রত্যাহার করার দাবি জানিয়েছে। আইন প্রণেতারা দাবিগুলিকে সমর্থন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
মেইতেই লিপুন, যাকে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আর. এস. এস) মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত বলে মনে করা হয়। মেইতেই লিপুন-এর নেতা প্রকাশ্যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং বিজেপি নেতা বীরেন সিং এর মেইতেই-এর প্রতি আনুগত্যকে প্রকাশ করেন।
মেইতেই লিপুন এবং আরামবাই তেংগোল উভয়েই কুকি নেতাদের কাছ থেকে তাদের জনগণের বিরুদ্ধে মেইতেই সম্প্রদাযয়ের আক্রমণেকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছে। আরামবাই তেংগোল যেখানে হিন্দুধর্ম থেকে আলাদা একটি শক্তিশালী মেইতেই জাতীয়তাবাদী অবস্থানের দিকে ঝুঁকেছেন, সেখানে মেইতেই লিপুন আরএসএস এবং বিজেপির নেতৃত্বে হিন্দুত্ব প্রচারের সঙ্গে যুক্ত।
মেইতেই লিপুনের নেতা প্রামোত সিং বলেছিলেনঃ "আমরা [মেইতেইরা] সনাতন ধর্মের অনুসারী। ... যদি মেইতেই বিলুপ্ত হয়ে যায়, তাহলে কাশ্মীরি পণ্ডিতদের মতো মণিপুরেও সনাতন ধর্মের শেষ ঘাঁটিটি চলে যাবে। "
অন্যদিকে, পুনর্জাগরণবাদীরা মেইতেইদের ভারতের অন্যান্য অংশের থেকে আলাদা বলে মনে করেন এবং তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় পরিচয় বহন করার মতাদর্শ দেয় এবং মনে করে ১৯৪৯ সালে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কাংলেইপাক সাম্রাজ্যই মণিপুর নামে ভারতে একীভূত হয়।
অসম রাইফেলসের উপস্থাপনা অনুসারে, সংঘর্ষটি তিনটি পর্যায়ে বিভক্তঃ "শুরু", "পরিবর্তিত" এবং "অচলাবস্থা"। এই পর্যায়গুলির মধ্য দিয়ে কীভাবে হিংসার প্রকৃতি ও চরিত্র পরিবর্তিত হয়েছে তা এটি তুলে ধরেছে।
ক্রমশ...
তথ্য সূত্রঃ আল জাজিরা।
.jpg)
.jpg)
.jpg)
.jpg)
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।