সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

গোচেলাঃ গিরিপথের হাতছানি। অন্তিম পর্ব।

চতুর্থ ব্রিজের নাম ‘প্রেকচু’। যে নদীর ওপর এই ব্রিজ নির্মিত তার নামানুসারেই এই ব্রিজের নাম রাখা হয়েছে। প্রেকচু নদী কিছুদূর গিয়ে রতঞ্চু নদীর সাথে মিশেছে এবং রতঞ্চু তিস্তায় গিয়ে মিশেছে আরও কিছুদূর যাওয়ার পর। প্রেকচু ব্রিজের নিকট কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আমরা আবার হাটা শুরু করলাম কিন্তু ততক্ষনে প্রায় ৩.৩০টে বেজে গেছে। এবারে পুরো পথটাই চড়াই। বাখিম যখন পৌছালাম তখন বিকাল ৫টা। বাখিম থেকে শোকা আরও তিন কিলোমিটার। ২০১১ সালের ভূমিকম্পে সিকিমের যে ক্ষতি হয়েছিলাম যা আমরা গত পুজোয় ইয়াম্থ্যাঙ ভ্যালি যাওয়ার সময় লক্ষ করেছিলাম, বাখিমে এসে তা আবার সচক্ষে দৃশ্যমান হল। এখানকার ট্রেকার হাটের নিচের দিকে বড়সড় ফাটল দেখা দিয়েছে যার ফলে এই ট্রেকার হাট এখন পরিত্যক্ত। সন্ধ্যে ৬.৩০টা নাগাদ আমরা শোকাতে পৌছালাম। অন্ধকারে এলাকা বিশেষ বোঝা যাচ্ছে না। তাই তখনকার মত আমরা আমাদের টেন্টে গিয়ে বিশ্রাম নেওয়াই শ্রেয় মনে করে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে টেন্টে প্রবেশ করলাম। ১৬ কিলোমিটার হাঁটার পরে আমরা প্রত্যেকেই কম বেশী ক্লান্ত থাকায় তাড়াতাড়ি রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। ঘুম ভাঙল তাসিজির আওয়াজে। টেন্ট থেকে বেড়িয়ে প্রথম সূর্যের আলোয় শোকাকে ছোট একটা পাহাড়ি গ্রাম বলে মনে হল। যদিও গ্রামের ঘরবাড়ির সংখ্যা ৫-৬টার বেশী হবেনা এবং অধিকাংশই ট্রেকার হাট হিসেবে ব্যবহৃত হয়। প্রথমবার ঈশান কোণে আকাশচুম্বী বরফাবৃত পর্বতমালা দেখতে পেয়ে মনের মধ্যে এক নতুন প্রেরণার সঞ্চার হল। পাহাড় সবসময়ই এক আশার আলো দেখায়। কষ্টকে সহ্য করে এগিয়ে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। তাসিজিকে জিজ্ঞেস করাতে বলল ওটা মাউন্ট পান্ডিং এবং আমাদের জার্নি নাকি শেষ হবে মাউন্ট পান্ডিংএর  পদতলে গিয়ে। এই কথা শুনে খানিক অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম যে পর্বতের একটা চুড়াকে এখন ঈশান কোণ থেকে দেখছি তার পদতলে গিয়ে আমাদের পথ শেষ হবে? আসলে পথই জানে পথের হদিশ মন শুধুই আনকোরা। 
দ্বিতীয় দিনে আমাদের গন্তব্য জংরি। কিন্তু যেতে যেতে তাসিজি জানাল যে আমরা আজ জংরির পরিবর্তে ডোরিঙে থাকব কারণ আগামীকাল ভোরে সূর্যোদয় দেখতে আমাদের জংরি টপে উঠতে হবে এবং সেটা ডোরিঙ থেকে কাছে হবে। জংরি থেকে ডোরিঙ এক থেকে দেড় কিলোমিটারের মত, একটি সুবিশাল বিস্তীর্ণ পাহাড়ি উপত্যকা, কোন জনবসতি নেই। ডোরিঙের থাকার আর একটি উদ্দেশ্য ছিল এখান থেকে টেন্টে শুয়ে শুয়েই কাঞ্চঞ্জঙ্ঘা পর্বতমালার কিছু অংশ দেখা যায়। কিন্তু আমরা যখন বিকেল বেলায় পৌছালাম তখন আকাশ মেঘাচ্ছন্ন, কিছুই দৃশ্যমান নয়। এছাড়া আমাদের গ্রুপের এক সদস্য হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরায় নতুন এক সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল। সারা সন্ধ্যে ধরে কাছে থাকা নানারকম ওষুধ খেয়েও যখন সে একটুও সুস্থ বোধ করছে না তখন আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম যে আগামীকাল আমরা এখানে থেকে যাব।  পরদিন ভোর ৩টের সময় উঠে আমরা জংরি টপের দিকে উঠতে শুরু করলাম। চারিদক অন্ধকার, আলো বলতে ভরসা প্রত্যেকের হাতের টর্চ। প্রচণ্ড চড়াই রাস্তা হওয়ায় জংরি টপে উঠতে অনেকটা সময় লেগে গেল। জংরি টপে উঠে কিছুক্ষন অপেক্ষা করার পরই সূর্যোদয় হল আর তখনই কমলা আভা ছিটকে এসে লাগল আমাদের সামনে প্রাচীরের মত দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতমালায়। তাসিজি বলল সামনের পর্বতমালার প্রতিটির একটি নির্দিষ্ট নাম আছে। এগুলি হল সাউথ কাবুর, নর্থ কাবুর, মাউন্ট পান্ডিং, তেঞ্জিংখাঁ, মাউন্ট নার্সিং, লামা লামুই ও কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতশ্রেণী।   
জংরি টপ থেকে নেমে এসে দেখলাম আমার বন্ধু এখনও শায়িত। ঘুম থেকে ডেকে তুলতে সে জানাল আর উপরে উঠবে না নিচে ইয়ুক্সামে নেমে যাবে। অগত্যা জংরিতে থাকা অন্য একটি দলের সাথে তাকে নামাবার ব্যবস্থা করে দিয়ে আমরা প্রাতরাশ সেরে তৃতীয় দিনের গন্তব্য থান্সিঙের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। থান্সিং যেতে হলে ডোরিঙ উপত্যকা বরাবর অনেকটা হেঁটে লাল জেঠিতে পৌছাতে হয়। লাল জেঠি থেকে পাহাড়ের ঢাল বরাবর কোকচুরং নদীর পাদদেশ অবধি নেমে আবার চড়াই পথে বেশ খানিকটা পথে যাওয়ার পর আসে থান্সিং ভ্যালি। দুইদিকে পাহাড় এবং একধার দিয়ে বয়ে চলা কোকচুরং নদী নিয়ে বিস্তৃত এই থান্সিং উপত্যকা। সিকিম সরকারের একটি ট্রেকার হাট এখানে আছে কিন্তু বেশীরভাগ ট্রেকাররাই টেন্টে থাকতে বেশী পছন্দ করে। থান্সিং যাওয়ার পর আমাদের নতুন প্রাপ্তি ‘হাই অল্টিটিউড ক্রিকেট’। হ্যাঁ ঠিক এই নামটাই দিয়েছিল আমার বন্ধু। স্থানীয় কিছু গাইড পোর্টার এবং কিছু বিদেশী ট্রেকাররা এই ভ্যালিতে ক্রিকেট খেলছিল সেটা দেখে আমরাও আর লোভ সামলাতে না পেরে সেই কনকনে ঠাণ্ডার হাত থেকে খানিক রেহাই পেতে নেমে পরেছিলাম খেলতে। খেলা শেষ করে টেন্টে ফিরে গিয়ে খিদের সময় গরম গরম নুডলস এবং সুপ এককথায় অপূর্ব লেগেছিল। এদিকে পরদিন আমরা যাব লামুনে। লামুনে এখান থেকে খুব দূরে নয়। ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে পৌছে যাওয়া যায়। কিন্তু লামুনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল এখানে হাওয়ার গতি অনেকটাই বেশী এবং এতটাই বেশী যে মাঝে মধ্যে ছোট নুড়ি পাথরও উড়ে বেড়ায় বলে শোনা যায়। তাই খানিক চিন্তার ভাঁজ কপালে রেখেই রাতে ঘুমাতে গেলাম। পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হল। টেন্টের বাইরে বেড়িয়ে ভ্যালির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে আলাপ হল নিউ ম্যাক্সিকো থেকে আশা জোশের সাথে। জোশ এবং তার সঙ্গিনী প্রায় ২মাস ধরে ভারত ভ্রমন করে চলেছে। আজ বেলায় তারা গোচেলায় যাবে। লামুনেতে যাওয়ার সময় পথে আবার দেখা হল জোশের সাথে। তারা তখন গোচেলা থেকে ফিরছে। জানাল আবহাওয়া খুবই ভালো, আকাশ একেবারে পরিষ্কার এবং দৃশ্যও অত্যাধিক সুন্দর। আমরা লামুনেতে পৌছে বেশীরভাগ সময় বিশ্রাম নিয়েই কাটিয়ে দিলাম। সন্ধ্যে সন্ধ্যে ডিনার শেষ করে তাসিজির নির্দেশ মত ঘুমিয়ে পড়লাম। রাত ১টায় অ্যালার্ম বাজল। ঘুম থেকে উঠে ব্যাগে যাবতীয় যা শীতের পোশাক ছিল সব পরে আমরা তৈরি হয়ে নিলাম গোচেলার উদ্দ্যেশে পাড়ি দেওয়ার জন্য। গোচেলা ভিউ পয়েন্ট ওয়ান প্রায় ১৬০০০ ফুট উঁচু এবং ভিউ পয়েন্ট টু প্রায় ১৮০০০ ফুট। গোচেলা ভিউ পয়েন্ট ওয়ান যেতে হলে সমিতি লেক হয়ে যেতে হয়। যাওয়ার সময় অন্ধকার থাকায় কিছুই দেখা যায়না তাই সকলেই ফেরার সময় সমিতি লেক দেখতে পায়। গোচেলা ভিউ পয়েন্ট ওয়ানে যখন পৌছলাম তখন ভোর ৫:১০। সূর্য উঠতে এখনও ১০ মিনিট দেরি। সামনে বিস্তীর্ণ এক উপত্যকা আর তারপরই কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতশ্রেণী। ইন্টারনেট জানান দেয় গোচেলা ট্রেকিংই এমন একটি ট্রেকিং পৃথিবীর মধ্যে যেখান থেকে এত কাছ থেকে পর্বতশ্রেণী দেখা যায়। দুধ সাদা বরফে আবৃত কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতশ্রেণী তখন আমাদের চোখের সামনে। ঠাণ্ডায় কাপতে কাপতে আমরা তখন অবাক সেই দৃশ্য দেখছি। কিছুক্ষণের মধ্যেই উদীয়মান সূর্যের আলোর ছটা ছিটকে এসে লাগল কাঞ্চনজঙ্ঘার গায়ে। তীব্র সাদা রঙের মধ্যে যদি হাল্কা কমলা রঙ মেশানো হয় তবে যেরকম রঙ হয় আমরাও ঠিক সেইরকম রঙই পর্যবেক্ষিত করলাম। সময়ের সাথে সাথে রঙের মানও পরিবর্তন হতে লাগল। হাল্কা কমলা থেকে গাঢ় কমলা হয়ে তারপর লাল হয়ে শেষমেশ হলুদ রঙে চারিদিক ছয়লাপ হল। এই দৃশ্য দেখার জন্যই বুঝি এতটা পথ এতটা কষ্ট করেও আসা যায়। 
আমাদের এরপরবর্তি গন্তব্য গোচেলা ভিউ পয়েন্ট টু। গোচেলা ভিউ পয়েন্ট টু যেতে হলে ওয়ান থেকে প্রচণ্ড খাঁড়াই এবং দুর্গম পথে অনেকটা নেমে জোমাথাঙ উপত্যকার মধ্যে দিয়ে বেশ কিছুটা সমতলে হেঁটে যাওয়ার পর আবার দুর্গম এবং চড়াই পথে বেশ কিছুটা পথ উঠতে হয়। পথ বলতে এখানে কিছুই নেই, দুপা একসাথে পাশাপাশি রাখাও যায়না। নুড়ি ও গুঁড়ো পাথর থাকায় পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল। অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করে এগিয়ে যেতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই হাজার ফুট নিচের গভীর খাদে পড়া ছাড়া আর কোন উপায় নেই। যেখানে মৃত্যু অনিবার্য। এইরকম ভয়ঙ্কর পথ দিয়ে আরেক বন্ধু অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাকে নিচে রেখে আমরা দুইজন ও আমাদের গাইড তাসিজি এগিয়ে যেতে থাকলাম। ভিউ পয়েন্ট ওয়ান থেকে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা হেঁটে আমরা পৌছালাম ভিউ পয়েন্ট টুতে। ভিউ পয়েন্ট টু থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে। ভিউ পয়েন্ট টুএর একদিকে মাউন্ট পান্ডিং এবং উল্টোদিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা। ভিউ পয়েন্টের নিচে গোচেলা লেকের পাদদেশ থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা প্রাচীরের মত উঠে গেছে। তাসিজিই জানাল সিকিমে কাঞ্চনজঙ্ঘায় রক ক্লাইম্বিঙ করা যায়না কারণ সিকিমে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে পবিত্র হিসেবে ধরা হয়। গোচেলা পাস বা ভিউ পয়েন্ট থ্রি পয়েন্ট টু থেকে আরও ঘণ্টা দুয়েকের রাস্তা এবং রাস্তা আরও কঠিন এবং দুর্গম তাছাড়া আমাদের শরীরও অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং নিচে এক বন্ধু অসুস্থ হয়ে বিশ্রাম করছে, কাজেই পাসের দিকে না গিয়ে ফেরবার পথ ধরলাম আমরা। ফেরবার পথে আবার গোচেলা ওয়ানে যখন পৌছলাম তখন মেঘ এসে ঢেকে দিয়েছে চারিদিক। কাজেই আর সময় নষ্ট না করে আমরা নিচের দিকে নেমে যেতে লাগলাম কারণ পথ তখনও অনেকটা বাকি। সমিতি লেকের কাছে আসতে মেঘ আরও ঘন হতে লাগল। ভুমিকম্পের ফলে সমিতির লেকের আয়তনও অনেকটা কমে গেছে বলে জানলাম। প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ সমিতি লেক হয়ে লামুনেতে ফিরে আসার পর আমাদের পায়ের অবস্থা একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছিল। কিন্তু তাসিজি এসে জানাল আমরা লাঞ্চ করেই আজ থান্সিং ফিরে যাব কারণ আবহাওয়ার অবস্থা খুব একটা ভালো নয় যেকোনো সময়ই ঝড় ও তুষারপাত শুরু হতে পারে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে কোন রকমে দুল্কিচালে যখন থান্সিং এসে পৌছালাম তখন প্রায় সন্ধ্যে ৬টা। হিসেব করে দেখলাম লামুনেতে এক ঘণ্টার বিরতি বাদ দিয়ে আমরা প্রায় সতেরো ঘণ্টা হেঁটেছি। সমতল থেকে এতটা উপরে সমস্ত যোগাযোগের মাধ্যম বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যু ভয় উপেক্ষা করে এই দুর্গম পথ দিয়ে কয়েকজন শহুরে যুবক কিছু না পাওয়ার আশা সত্ত্বেও ক্রমাগত হেঁটেই চলেছে। আসলে এই হেঁটে চলার অর্থ হল নিজের সাথে অনেকটা পথ এগিয়ে চলা, নিজেকে অনেকটা ভালো করে চিনতে শেখা আর সমস্ত না পাওয়াদের মাঝে আরও একবার নতুন করে অনেক কিছু পাওয়ার আশা সঞ্চয় করে ফিরে আসা। প্রতিটা পাহাড়ি পথ, উপত্যকা, নদী সমস্ত কিছু আমাদের এই শিক্ষা দিয়েছে যে জীবনের চলার পথটা অনেকটা বড় এবং চড়াই উৎরাই। কষ্ট হলেও সেই পথ পেরোতে হয় কারণ পথের শেষে কিছু না থাকলেও নিজের আত্মবিশ্বাস সেই পর্যায়ে গিয়ে পৌছায় যেখান থেকে আবার নতুন করে নতুন পথের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়া যায়। 
থান্সিং থেকে পরদিন আমরা কোকচুরংএ নেমে এলাম। আবহাওয়ার অবস্থা খারাপ থাকায় সেইদিন টেন্টে না থেকে ট্রেকার হাটে থাকবার সিদ্ধান্ত নিলাম। এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে ঘরটার চারিদিকে। কত মানুষ তাদের স্মৃতির কথা লিখে গেছে ঘরটার দেওয়াল জুড়ে। আমরাও আমাদের স্মৃতি বাক্য লিখে রেখে পরদিন সকালে শোকা যাওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। আকাশের অবস্থা খুব খারাপ। ঘন মেঘে চারিদিকে এতটাই ছেয়ে রয়েছে যে প্রায় কিছুই দেখা যায়না। রডড্রেনড্রনের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আসতে আসতে দেখলাম গাছ গুলো কুঁড়িতে ছয়লাপ, আর কিছুদিনের মধ্যেই রঙ বেরঙের রডড্রেনড্রনে ভরে উঠবে এই জঙ্গল। আসতেই আসতেই রাস্তায় বৃষ্টি পেলাম। শোকাতে যখন পৌছালাম তখন মুষল ধারায় বৃষ্টি নেমে গেছে সঙ্গে ঝোড়ো হাওয়া। হাওয়ার পরিমান এতটাই বেশী যে আমাদের টেন্ট একেবারে ধরাশায়ী, এদিকে ট্রেকার হাটেও আর জায়গা নেই অগত্যা পোর্টারদের জন্য নির্মিত থাকার যায়গায় কোনরকমে ওই ভয়ানক ঠাণ্ডায় অল্প একটু যায়গায় মাথা গুঁজে বাকি রাতটুকু কাটাতে হল। পরদিন সকালে বৃষ্টির ভয়ে বেশ ভোর ভোর থাকতেই আমরা আমাদের ট্রেকিঙের অন্তিম দিনের হাটা শুরু করলাম ইয়ুক্সামের উদ্দেশ্যে। বেলার দিকে যখন পৌছালাম তখন দেখলাম আমার বন্ধু এখন একাবারে সুস্থ এবং আমাদের কাছে ট্রেকিঙের গল্প শুনে সে এখন হাহুতাশ করছে। 
পরেরদিন ইয়ুক্সাম থেকে জোরথাং হয়ে নিউ জলপাইগুড়ি যখন পৌছালাম তখন প্রায় বিকেল। ষ্টেশনের ওয়েটিং রুমে বসে কাটিয়ে আসা দিন গুলোর কথাই চিন্তা করতে লাগলাম। নির্দিষ্ট সময়ে প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে উঠে রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে যখন বার্থে ঘুমাবার উদ্দেশ্যে শুলাম তখন মনে হল আগামীর সকাল একটা নতুন সকাল, আগামীদিন একটা নতুন দিন, আগামীর দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য জোরকদমে লেগে পরতে হবে, আবার কোন এক পাহাড়ি উপত্যকায় ঘুম থেকে উঠে শ্বেতশুভ্র পর্বতমালাকে দুচোখে পর্যবেক্ষণ করবার জন্য জীবনের ঘোড়দৌড়ে এগিয়ে যেতে হবে, বেঁচে থাকতে হবে। 

শেষ।
দেবী প্রণাম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...