একটা জার্নি শুরু হয় একরাশ আশা নিয়ে আর শেষ হয় অনেক কিছু পাওয়া দিয়ে। আমাদের ক্ষেত্রেও এর কোন বিরূপ হয়নি। গত পুজোয় গ্যাংটক থেকে ফিরে আসার পরই আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম ট্রেকিংএ যাব। এর আগে ট্রেকিংএর বিশেষ কোন অভিজ্ঞতা ছিলনা। বছর দেড়েক আগে প্রথম ট্রেকিং সান্দাকফু। সেই প্রথম অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেওয়া। কিন্তু ফিরে আসার পরই পাহাড় এক অদ্ভুত মায়ায় আকর্ষণ করেছিল আমায়। বিশেষ করে সারাটা দিন পাহাড়ের গা ঘেঁষে হেটে এসে একসময় তার চূড়ায় পৌঁছানো। সামনে বিস্তীর্ণ বরফাবৃত পর্বতমালা, নিচে জমাট হয়ে থাকা মেঘ, সূর্যের আলোর রামধনু রঙে চারিদিকে ছড়িয়ে যাওয়া এক অদ্ভুত মায়ায় আমাকে বেঁধে নিয়েছিল। যে মায়ার ডোর আবার আমায় পাহাড়ের অভিমুখে যেতে আহ্বান জানাল। আর এবারের গন্তব্য গোচেলা।
গোচেলা আদতে একটি পাস। ‘লা’ শব্দের ইংরাজি অর্থ পাস অর্থাৎ গিরিপথ। পশ্চিম সিকিম থেকে উত্তর সিকিমে যাওয়ার একটি পাস বা রাস্তা। দুর্গম পথের কারনে সাধারণত চলাচলের জন্য এটা ব্যবহৃত হয়না। এটি একটি ট্রেকিংপয়েন্ট। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষদের কাছে এটা একটা অন্যতম প্রধান ডেসটিনেশন। এখানে আসার উপযুক্ত সময় হল এপ্রিল-মে এবং অক্টোবর-নভেম্বরের সময়। অনেক ট্রেকিং ক্লাব এই ট্রেকের আয়োজন করে থাকে তবে নিজেরাও আসা যায়। সেক্ষেত্রে ইন্টারনেট থেকে বা আগে যারা এসেছে তাদের কাছ থেকে গাইডের ফোন নাম্বার জোগাড় করে তার সাথে কথা বলে বুক করে সমস্ত নিয়মকানুন জেনে নেওয়া। যথারীতি আমরাও নিয়ম মেনে চার মাস আগেই আমরা আমাদের ট্রেনের টিকিট কেটে ফেললাম। এবার শুরু হল তথ্য যোগার করার পালা। ইন্টারনেট ব্যবহার করার মাধ্যমেই জানলাম যে গোচেলা ট্রেকিং হল অন্যতম একটি কঠিন ট্রেকিং রুট। যার শুরু হয় ইয়ুক্সাম থেকে। ইয়ুক্সাম সিকিমের প্রথম রাজধানী ছিল। যার পত্তন করেন ফুনসুগ নামগেয়াল, সিকিমের প্রথম রাজা। ইয়ুক্সামের বহুল জনপ্রিয় ডুপডি মোনেস্ট্রিও ফুনসুগ নামগেয়াল-ই তৈরি করেন। এবারে শুরু হল শরীরকে ফিট করার কাজ। দুর্গম পাহাড়ি পথ ওঠার জন্য শরীরকে যথেষ্ট ফিট রাখা প্রয়োজন। কিন্তু ভাবনাই সার হল আমার। সকালে নিয়ম করে হাটা, একটু দম বাড়ানো, সাঁতার কাটা, একটু ছুটোছুটি এসব কিছুই করা হয়নি। কিন্তু তবুও ভিড় ট্রেনে ঝুলতে ঝুলতে বাড়ি ফিরতাম রোজ, সাইকেলে চেপে এদিক ওদিক যাওয়া তো লেগেই থাকত, ট্রেন ধরার জন্য এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে ছুটে আসতে হত আর কাজের জন্য এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত অবধি হাঁটাহাঁটিও মাঝে মধ্যে করতে হত তবে এসবের থেকে যেটা বেশী ছিল সেটা হল মনের জোর। মন যখনই বলেছে পারবো তো? ঠিক তখনই দেখতে পেয়েছি জানলার বাইরে কাঞ্চনজঙ্ঘার হাতছানি।
যথারীতি যাওয়ার দিন এসে গেল। কিন্তু তার আগে যাবতীয় সরঞ্জাম জোগাড় করে নিতে হল। ইন্টারনেট জানান দিল গোচেলায় রাতের বেলা -১৩ ডিগ্রীর কাছাকাছি তাপমাত্রা থাকবে সঙ্গে ঝোড়ো বাতাস। বুঝতেই পেরেছিলাম কলকাতার ঠাণ্ডা থেকে অনেক কদম এগিয়ে থাকবে এই ঠাণ্ডা। কাজেই ব্যবস্থাও নিতে হয়েছিল সেইমত। এই পরিসরে জানিয়ে রাখি তারই কিছু টুকরো খবর। স্লিপিং ব্যাগ, ম্যাট, হলোফিল জ্যাকেট, রুকস্যাক, টেন্ট ইত্যাদি ট্রেকিঙের যাবতীয় সরঞ্জাম ভাড়া এবং কেনার জন্য বালিগঞ্জের ফাঁড়ির অ্যালপাইন এবং শিয়ালদহ ষ্টেশন সংলগ্ন উবেক অন্যতম। গোচেলা যাওয়ার জন্য টেন্ট ভাড়া করতে হয় কারণ গোচেলা যাওয়ার পথে যেখানে যেখানে হল্ট করে যেতে হয় তার সব যায়গায় ট্রেকার হাট নেই আর থাকলেও তাতে খুবই কম লোকের স্থান হয়। তাই টেন্টই ভরসা। টেন্টের সাথে প্রয়োজনীয় খাবারও সঙ্গে নিয়ে যেতে হয় কারণ ট্রেকিংশুরু হওয়ার পরে আর কিছুই পাওয়ার সম্ভবনা থাকে না। পাহাড়ে ওঠার ক্ষেত্রে যে টুকটাক খাবার প্রত্যেকের সঙ্গে রাখা উচিত তাহলো, গ্লুকোস জাতীয় কিছু খবার, চকোলেট, আমসত্ত্ব, খেজুর এবং শরীরকে গরম রাখার জন্য ভুট্টা ভাজা এবং অবশ্যই নিজের সঙ্গে একটি জলের বোতল এছাড়াও দমের ঘাটতি মেটানোর জন্য কর্পূর রাখা আবশ্যিক। একটি ছোট কৌটোয় কর্পূর রেখে তার ঘ্রাণ বারবার নিতে নিতে উপরে উঠতে থাকলে দমের ঘাটতি মেটে। এবং অবশ্যই নিজের শরীরের ক্ষমতা অনুযায়ীই হেঁটে যাওয়া উচিত। প্রয়োজনে বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার হাঁটা শুরু করা উচিত।
আমাদের ট্রেকিঙের দিন ধার্য হল আট। আটদিনের খাবার সঙ্গে নিয়ে উঠতে হবে। ঠিক করলাম কিছু খাবার আমরা এখান থেকে কিনে নিয়ে যাব। বেশ কিছু প্যাকেট ম্যাগি, চাল, ডাল, আলু তৎসহ কিছু ড্রাই ফুড সঙ্গে নিয়ে নিলাম। বাকিটা ইয়ুক্সাম থেকে কিনে নেওয়া হবে বলে ঠিক করে নেওয়া হল। অবশেষে যাওয়ার দিন এসে গেল। রাত ১১ টার পদাতিক মেলে চেপে বসলাম আমরা। আমরা অর্থাৎ আমি ও আমার তিন বন্ধু। স্বস্তিক, সুমন ও অভিষেক।
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই দেখি দুপাশে সবুজ আমবাগানের মধ্যে ট্রেন ছুটে চলেছে। বুঝতে পারলাম আমরা গৌড় বাংলার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছি। ট্রেন ১ ঘণ্টা লেটে সকাল ১০ টা নাগাদ অন্তিম ষ্টেশন নিউ জলপাইগুড়িতে পৌছালো। এবার শুরু হল গাড়ি খোঁজার পালা। সাধারণত নিউ জলাপাইগুড়ি ষ্টেশন সংলগ্ন গাড়ির স্ট্যান্ড থেকে ইয়ুক্সাম যাওয়ার গাড়ি সচরাচর পাওয়া যায়না। যেতে হলে আলাদা করে রিসার্ভ করে যেতে হয় কিন্তু সেটা বেশ ব্যয় সাপেক্ষ। তাই ভায়া জোরথাং হয়েই সচরাচর সবাই যায়। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে জোরথাং এবং সেখান থেকে ইয়ুক্সাম। ১১টার কাছাকাছি গাড়িতে উঠে আমরা জোরথাঙ পৌছালাম যখন তখন বেলা প্রায় ৩টে ছুইছুই। এই পরিসরে বলে রাখি শিলিগুড়ির পায়েল সিনেমাহল সংলগ্ন এলাকা থেকে সিকিমের যে কোন যায়গায় যাওয়ার গাড়ি অত্যন্ত সুলভে পাওয়া যায়। আগে থেকে ফোন করে বুক করে নেওয়ার ব্যবস্থাও আছে (যোগাযোগ- ৭৭৯৭০৯০৭৯১)। যখন ইয়ুক্সাম পৌছালাম তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন আমাদের গাইড তাসিজি (যোগাযোগ- ৭৭৯৭৩৯৫২৮৭)। তাসিজি ১৬ বছর ধরে গোচেলা ট্রেকিং রুটে গাইডের কাজ করেন এবং অফ সিজনে এলাচের চাষ করেন। অত্যন্ত সরল সাধাসিধে এই পাহাড়ি মানুষ গুলোর সাথে কথা বললেই বোঝা যায় মানুষ হিসেবে মানুষের অস্তিত্ব এখনও রয়ে গেছে।
ইয়ুক্সামে আমরা কোন হোটেলে উঠিনি। আমরা তাসিজির বোনের হোমস্টেতে ছিলাম। কোথক লেকের অনতিদূরেই এই হোমস্টে। যারা শুধুমাত্র ইয়ুক্সামে ঘুরতে যায় সস্তায় এই হোমস্টে তাদের পক্ষে বেশ উপযোগ্য। স্নান সেরে গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতেই হাতে এক লম্বা লিস্ট নিয়ে তাসিজি আর আমাদের কুক অংচকজি এসে হাজির। আগামী আট দিনের খাবারের লিস্ট। বাজার থেকে সেই লিস্ট ধরে সবকিছু কিনে আনার পর রাতে তাড়াতাড়ি খাওয়া দাওয়া করে আমরা যে যার বিছানায় লম্বা ঘুম দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়লাম। আগামী আটদিন কিভাবে কাটবে কতটা ঘুম হবে এই ভাবতেই ভাবতেই কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম খেয়াল নেই।
পরদিন ঘুম ভাঙল খুব সকালে। আশপাশটা ঘুরে দেখার জন্য বের হলাম। আমাদের হোমস্টের অনতিদূরেই বাজার। খুব সকাল সকালই সমস্ত দোকান খুলে গেছে। আমাদেরও বেশ কিছু টুকটাক জিনিস কেনার ছিল, কিনতে গিয়ে আলাপ হল সবজি বিক্রেতা ইরফানের সাথে। ইরফানের বাড়ি বিহারে কিন্তু সে এখন এখানেই থাকে। কাজের সন্ধান করতে করতে একদিন এখানে এসে সবজির পসরা সাজিয়ে বসে পরে। তারপর থেকে রোজ সকাল ৬টা হলেই ইরফান দোকান খুলে বসে পড়ে। ইরফানের থেকেই জানলাম সমস্ত সবজি তাকে শিলিগুড়ি থেকে নিয়ে আসতে হয়। একদিন ছাড়া ছাড়া সে শিলিগুড়ি গিয়ে সবজি নিয়ে আসে। এই কথোপকথনের মধ্যেই তাসিজির ফোন। প্রাতরাশ প্রস্তুত, খাওয়া দাওয়া করে আমাদের বেড়তে হবে। নিজেদের হোমস্টের কাছে পৌছেই দেখলাম আমাদের সমস্ত মাল বহন করে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি ইয়াক এসে হাজির। আমাদের মধ্যেও উদ্দীপনা বেড়ে গেল। আমরা ছাড়াও আমাদের সাথে আমাদের গাইড তাসিজি, আমাদের কুক অংচকজি, আমাদের ইয়াকম্যান বাইচুং, পোর্টার লাপকাজি ছাড়াও তিনটে ইয়াক উঠবে। এবং শুধু উঠবে না গলায় বাধা ঘণ্টা টং টং করতে করতে আমাদের প্রতিদিন আমাদের আগে উঠে আমাদের জন্য তাঁবু খাটিয়ে চায়ের আসর জমিয়ে অপেক্ষা করবে। অনেকরাতে একদিন ইচ্ছে হয়েছিল এই হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় ইয়াকগুলো কি করছে দেখার। দেখতেই বেরিয়েই আবিস্কার করলাম মাথার উপর অনন্ত বিস্তৃত তারায় ভরা আকাশ। যে আকাশ আমার সমতল থেকে দেখা যায়না। যাইহোক প্রাতরাশ সেরে একে একে স্নান করে, ব্যাগ গুছিয়ে সকাল ১০ টা নাগাদ আমরা আমাদের প্রথমদিনের ট্রেকিঙে বেরোবার জন্য প্রস্তুত হয়ে পড়লাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই তাসিজির সাথে ‘জার্নি বিগিন্স’ সেলফি তুলে আমরা হাটা শুরু করলাম। কিছুদূর গিয়েই পারমিশন নেওয়ার অফিস, সেখান থেকে প্রয়োজনীয় কাজ মিটিয়ে আমরা এবারে পুরোদস্তুর মত হাঁটা শুরু করলাম। একটি ছোট পাহাড়ি জনবসতি পেরিয়ে আমরা এগিয়ে চললাম আমাদের প্রথম দিনের গন্তব্য শোকা’র উদ্দেশে। যদিও অনেকেই ইয়ুক্সাম থেকে প্রথমদিন শোকা না গিয়ে সাচেন কিংবা বাখিমে থেকে যায়। কিন্তু আমরা ঠিক করে নিয়েছিলাম আমরা প্রথমদিন একটু বেশী দূরত্বই এগিয়ে রাখব যাতে পরের দিকে শারীরিক কোন অসুবিধা হলে একদিন বিশ্রাম নিতে পাড়ি।
তাসিজি জানাল শোকা যেতে হলে চারটে ব্রিজ অতিক্রম করতে হবে আর প্রথম ব্রিজ থেকেই নাকি আসল ট্রেকিং শুরু তার আগের পথটুকু নাকি ‘মর্নিং ওয়াক’। যাইহোক আমরা আমাদের মর্নিং ওয়াক শেষ করে প্রথম ব্রিজ ‘পাখোলা’র সামনে এসে উপস্থিত হলাম। ‘পাখোলা’ ব্রিজের ওপরের দিক থেকে ঝর্ণার আকারে জল নেমে এসে নিচে রতঞ্চু নদীতে গিয়ে মিশেছে। ‘পাখোলা’ অতিক্রম করেই ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশানাল পার্ক’এর প্রবেশদ্বার। আরও বেশ কিছুটা এগিয়ে এসে দ্বিতীয় ব্রিজ ‘সুসেখোলা’। এখানে রাস্তার চড়াইয়ের পরিমান অনেক কম। রাস্তা বলতে আলাদা করে কিছু নেই পাহাড়ের পার ঘেঁষে হেঁটে যাওয়ার মত খানিকটা চওড়া পথ। তাও উল্টোদিক থেকে বা পিছনদিক থেকে ইয়াক বা ঘোড়া এসে গেলে পাহাড়ের ঢালে উঠে দাড়াতে হয়। তৃতীয় ব্রিজ ‘মিন্টোগাঙ’ অতিক্রম করে প্রথম ক্যাম্পিং সাইট সাচেনে এসে উপস্থিত হলাম। শক্তি সঞ্চয়ের জন্য গ্লুকোস, চকোলেট ইত্যাদি কিছু খেয়ে আবার হাটতে শুরু করলাম। ইন্টারনেট থেকেই জেনেছিলাম পাহাড়ে ওঠার সময় ক্যালোরির ঘাটতি মেটানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট বিরতির অন্তর অন্তর ‘সুগার’ বা মিষ্টি জাতীয় কিছু খাওয়া উচিত। এখানে যেতে যেতেই পরিচিত হলাম অস্ট্রেলীয় ক্রিকেট টিমের সাথে যুক্ত এক ভদ্রলোকের সাথে। এরপর রাস্তা উৎরাইের দিকে অর্থাৎ ঢালু। তাসিজি জানাল এই ঢাল বরাবর নেমে চতুর্থ ব্রিজ পার করে আবার ঢাল দিয়ে উঠে বেশ কিছুটা যাওয়ার পর আমরা শোকাতে পৌছাবো।
ক্রমশ।
দেবী প্রণাম ম্যাগাজিনে প্রকাশিত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।