সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

পিকেঃ আরও একটু সাহসিকতার প্রয়োজন ছিল।

আমার মনে হয় আমরা অধিকাংশ ভারতবাসীই আজকের সময়ে দাড়িয়ে ভাবি যে এই সোশ্যাল সিস্টেমের দশা একেবারে ভগ্ন। এই ভগ্নদশা যে বিভিন্ন আর্ট ফর্ম গুলোতে উঠে আসবে সেটাই কাম্য। কিন্তু আমরা বোধহয় শিল্পের নান্দনিক গুরুত্বের থেকে বিনোদনের গুরুত্বকেই প্রধান্য দিয়ে থাকি। তাই মানুষের সমস্যা কিংবা সিস্টেমের অপপ্রচার যাই হোকনা কেন তাকে বিনোদনের মোড়কে আবদ্ধ করেই পেশ করতে হয় নচেৎ ব্যাবসায়িক ধান্দা নিপাত যাবে। তাই আমরা ভাবলেও সিস্টেমের দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করতে পারিনা। ঠিক সেটাই বড় চোখে পড়ল রাজকুমার হিরানীর ‘পিকে’-তে।
ঠিক যেমন আমির খানের টেলিভিশন শো। যে বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনায় বসে সেগুলি নিঃসন্দেহে অবশ্যই স্পর্শকাতর কিন্তু তা আমাদের শুধুমাত্র এই বোধ উপলব্ধ করিয়েই সীমিত থাকে। প্রথাভিত্তিক জীবনকাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে ঠিক কে ঠিক কিংবা ভুল কে ভুল হিসেবে মেনে নিতে বলেনা। বলেনা এই উপলব্ধি থেকে আমাদের চারপাশে ঘটে চলা অন্যায়ের বিরোধিতা করতে বা নিদেনপক্ষে যুক্তিসঙ্গত ভাবে ভুল-ঠিকের কারন তুলে ধরতে।




পিকে’-তেও তাই যে বিষয় নিয়ে ১৫৩ মিনিট ধরে গল্প এগিয়ে চলে তা আপামর ভারতবাসীর সকলেরই জানা। আমরা জানি কিন্তু জেনেও না জানার ভান করে থাকি। কিন্তু কোথাও আমাদের পরিচালক এই বিষয়ের ওপর নিজের বক্তব্য প্রকাশ করেন না বা কোন প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দেন না কিংবা আমাদের এমন কোন পরিস্থিতির সামনে এনে উপস্থিত করান না যেখানে দাড়িয়ে তিনি বলতে পারেন এরপরেরটা আমাদের ঠিক করার দরকার আমরা কি করব। তাই আমরা ভাবিও না। কিছু হাস্যবোধক সংলাপ শুনে আনন্দ পাই আর অতঃপর একরাশ হাসি নিয়ে প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসি। কিন্তু কোথাও একবারও মনে করিনা আমাদের জীবনে ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রভাব কতটা এবং আমরা তার থেকে কতটা মুক্ত হতে পারব। তাই পিকের গল্পটা আমাদের গল্প হয়না। পিকে হয়ত বুঝলেও আমাদের বোঝাতে ব্যর্থ হয় ধর্মীয় গোঁড়ামির প্রভাব থেকে মুক্ত হওয়াটা কতটা প্রয়োজন।
যে ব্যাঙ্গের মোড়কে পিকের ন্যারেটিভ এগিয়ে চলে সেই ব্যাঙ্গ সামাজিক ধর্মীয় অন্ধতাকে আঘাত করেনা, সিস্টেমের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে না। তাই পিকের সমর্থকরা সকলেই নিজ নিজ জীবনেই মেতে থাকে তার মত নিজেদের ধারনার পরিবর্তনের খানিক চেষ্টাও করেনা। ছবির শেষের অংশে তাই প্রধান অভিনেত্রী পিকেকে মনে রাখবার মাধ্যমেই তার উপন্যাস শেষ করেন তার চেতনায় তাই ধর্মের এই অঙ্গুলিহেলন ধরা পড়ে না। কিংবা পিকের মননেও এই ধর্মীয় গোঁড়াচার ধরা পড়েনা, হারানো ভালোবাসার দুঃখেই সে পৃথিবীত্যাগি হন। সে তো কেবলমাত্র তার ফেরবার উপায়ের কথা জানতে গিয়ে এত ধর্মীয় অনাচারের সম্মুখীন হয়। তাই নিজের ফেরবার ব্যবস্থা হয়ে গেলে সেও মেনে নিতে বাধ্য হয় ধর্মের কথা, অধর্মের কথা।
পরিচালক বিন্দুমাত্র সাহস দেখানোর প্রয়োজন মনে করেননি ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে নিজের মত প্রকাশ করতে। তিনিও আমাদের মতন মেনে নিয়েছেন। একবারও মহসিন মখমলবাফের মত তার নিজের ছবি “দ্যা গার্ডেনার”-এ সশরীরে ক্যামেরার সামনে এসে ধর্মের বিরুদ্ধে কথা বলতে সক্ষম হননি। বলবার প্রয়োজন মনে করেননি আজকের দিনে সমস্ত হিংসা দাঙ্গার পিছনে মূল কারন ধর্ম। বলবার প্রয়োজন মনে করেননি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠা স্থাপিত হচ্ছে ধর্মের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক দলগুলির মূল প্রোপ্যাগান্ডা হয়ে গেছে ধর্ম। একবারও বলবার প্রয়োজন মনে করেননি রাস্তায় বানরসেনা নেমে রামের নামে জয়ধ্বনি দেওয়া আসলে একটা সার্বভৌম রাষ্ট্রকে ধর্মীয় রাষ্ট্র গড়ে তোলার ডাক।




হিরানীবাবু আপনি যেমন সারা ছবি জুড়ে আমাদের ধর্মীয় অবস্থান জানার জন্য ‘ছাপ্পা’ ‘ছাপ্পা’ করেছিলেন, আপনার জেনে রাখা প্রয়োজন আমাদের এখানেই শিশুর জন্মের পর তার যৌনাঙ্গ ছেদনের মাধ্যমে তাঁকে ধর্মীয় পরিচয় দিয়ে দেওয়া হয়। আপনার জেনে রাখা প্রয়োজন যে ধর্মে গোমাংস বিধর্মী বলে গণ্য করা হয় সেখানেই ধর্মের প্রয়োজনে অন্য পশুকে নিধন করা হয়। আপনার জেনে রাখা প্রয়োজন ১৯৯২ সালে যারা বাবরি মসজিদ ভাঙে তারাই এখন সরকারে এসে ডাক দিয়েছেন গীতাকে জাতীয় ধর্মগ্রন্থ করবার, তারাই বলেছেন ধর্ম পরিবর্তনের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হবে। কিন্তু আপনি যে কেবলই শুধু উপরের অংশটুকু দেখালেন ধর্মের প্রভাবে সমাজের যে পরিস্থিতি হয়েছে তার কথা দেখানো তো দূর একবার বলবার প্রয়োজন মনে করলেন না। তাই আদপে আপনার ছবিটি একটি টিপিক্যল বলিউড কমেডি-ড্রামা ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই তারাই এই ছবির প্রশংসা করবেন যারা এগুলিই দেখতে অভ্যস্ত। যাদের মননে “মেমরিজ অফ আন্ডারডেভেলপমেন্ট”-এর কোন প্রভাব নেই। যারা শুধু মুখেই বলতে পারে সোলানাসের ক্যামেরা নয় এ যেন বন্দুক। যারা শুধু স্ট্যাটাস দিতে পারে "All you need for a movie is a gun and a girl"(Godard) কিন্তু কখনই সমর্থ হয়না একটি মিস-অন-সিনে গল্পের ন্যারেটিভের পাশাপাশি সামাজিক অবস্থানকেও চিহ্নিত করতে। তারাই বাহবা দেবে কারন তারাই দীর্ঘদিন যাবত কিছু উত্তরাধুনিক শহুরে বায়াস্ড মানুষের জীবন বৃত্তান্ত দেখিয়ে চলেছে। একবারও প্রান্তিক মানুষের জীবনশৈলীর কথা ভাবতে পারেনি। এই তারাই “হায়দার”-কে খারাপ বলে দাবী করে। এই তাদের জন্যই যারা মানুষের কথা ভেবে কাজ করতে আগ্রহী হন তাদের বেকার হয়ে থাকতে হয়। এরাই অন্যায়ের হয়ে গলা ফাটান, রাজপথে নামেন। একজন প্রকৃত শিল্পী যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে চুপ করে থাকেন কিংবা অন্যায়ের হয়ে গলা ফাটান তাহলে সে কোনদিনই প্রকৃত শিল্পী হয়ে উঠতে পারেননা। তাই চ্যাপলিনকে কমিউনিস্ট তকমা নিয়ে আমেরিকা ছাড়তে হয়েছিল।
কিন্তু এতদসত্তেও হিরানীবাবু আপনি প্রশংসা প্রাপকের দাবীদার কারন ধর্মের নিরিখে যে গোঁড়া সত্য লুকিয়ে আছে যা আমাদের সকলেরই জানা সেই সত্যকে খানিক হলেও উন্মোচন করতে পেরেছেন। আর যাই হোক সোশ্যাল স্যাটায়ার সোশ্যাল স্যাটায়ার বলে মিডিয়ার মাথায় উঠে যাননি।  


ছবি- পিকে
অভিনয়ে- আমির খান, অনুস্কা শর্মা, সুশান্ত সিং রাজপুত, সঞ্জয় দত্ত প্রমুখ।
চিত্রনাট্য ও সংলাপ- অভিজাত যোশী ও রাজকুমার হিরানী।
পরিচালনায়- রাজকুমার হিরানী। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...