বিদেশী
লেখকদের লেখা পড়ার অভ্যাস আমার কোনকালেই ছিল না। বিদেশী ভাষাটা আওত্তের বাইরে সহজে
বুঝি না পড়ে তাই ও পথে যাইনি। কিন্তু ছবি নিয়ে পড়বার উদ্দেশ্যে যখন বের হলাম বিরাট
হল ঘরে যখন চুপচাপ বসে থাকতাম এমনই একদিনে পরিচিতি হল ভদ্রলোকের সাথে। কল্লোল দা
বলেছিল কিভাবে মানুষ টা প্রথম জীবনে একজন সাংবাদিক থেকে পরবর্তী কালে লেখক
হয়েছিলেন। কিভাবে তিনি তার ইতিহাসকে নিয়ে এসেছিলেন আমাদের সামনে। আমি মুগ্ধ হয়ে
শুনতাম। শোষণের বিরুদ্ধে কিভাবে একজন গুনে চলেছে তার পূর্বজন্মের ইতিহাসকে।
প্রতিটা অংশ ছবির মত লাগত। তাই ইউনিভার্সিটি থেকে বেরিয়েই সেদিন একছুটে গিয়ে কিনা
ফেলেছিলাম ‘চিলিতে গোপনে’। সুবিধা হয়েছিল অনুবাদ করা ছিল আমার জন্য। দু রাতে এক
নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেলেছিলাম বইটা। কিভাবে একজন পরিচালক নিজের দেশে প্রবেশাধিকার
হারিয়ে দেশের সামগ্রিক পরিবেশের ছবি তুলতে ছদ্মবেশ ধারণ করে দেশে প্রবেশ করছেন।
পুরটাই যেন একটা ছবি। পরে দেখেছিলাম ছবিটা ‘ক্লানডেসস্টাইন ইন চিলি’। শুনেছিলাম ২৪
ঘন্টার এক সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে বইটা লিখেছিলেন উনি।
এরপর
একদিন যাদবপুরে সঞ্জয়দার কাছে শুনলাম ওনার শেষ উপন্যাসটার কথা। সঞ্জয়দা বলেছিল
ওনার পরা শ্রেষ্ঠ প্রেমের উপন্যাসের মধ্যে অন্যতম। কিছুদিনের মধ্যেই শুভঙ্করের বাড়ি
গিয়ে পেয়ে গেলাম বইটা। ছোট্ট একটা বই। ট্রেনে আসতে আসতে সেদিন পড়ে ফেলেছিলাম।
জীবনের শেষ লগ্নে এসে নিজের ভালোবাসার এ হেন বহিঃপ্রকাশ সেদিন সেই ক্লান্ত বিকেলে
আমায় ফিরিয়ে নিয়ে গিয়েছিল বেশ কিছুদিন আগে শুনশান ফাঁকা নির্জন এক প্ল্যাটফর্মে
যেখানে দাড়িয়ে আমিও প্রথমবার বুঝতে পেরেছিলাম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশের ছন্দ। এই
লেখাটা যখন লিখছি সামনেই টেবিলের ওপর রাখা বইটা ‘মেমরিজ অফ মাই মেলানকলি হোড়’। বারবার যখন ওনার বিভিন্ন লেখা পড়েছি এক অদ্ভুত অনুভূতি হয়েছে। নিজেকে খুব হাল্কা মনে হত। মনে হত বারবার একটাই স্বপ্ন দেখছি। আমি উড়ছি আকাশে পাখির মত অনেকটা। মেঘ কাটিয়ে আমি যেন এগিয়ে চলেছি এগিয়েই চলেছি। আর যখন আমি এগোচ্ছি এক অনাবিল আনন্দ অনুভব করছি। এমন আনন্দ যাকে শব্দের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা যায়না। এই আনন্দ অনুভুতি একদম আলাদা, একেবারে অন্য বাকি সব অনুভুতির থেকে। কিন্তু পরক্ষনেই মনে হত না এটা কোন স্বপ্ন নয় এটা বাস্তব। একেবারে চূড়ান্ত বাস্তব। আমি যেন বাতাসের সো সো শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমি যেন স্বপ্নে নয় বাস্তবে আছি। এমনটাই অনুভব হত।
আজ সকাল সময়টা যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। মৌন মেসেজ করল “আদি, মার্কেজ আর নেই”। নিজেকে হঠাৎ কোন ধু ধু প্রান্তরে একা দাড়িয়ে আছি মনে হল। মনে হল এক ধাক্কায় আমায় যেন কেউ আকাশ থেকে নিচে নামিয়ে এনেছে। মনে হল আমি যেন আর কোনদিন উড়তে পারব না। আর আমায় কেউ মনে করিয়ে দেবেনা স্বপ্নটাও আসলে বাস্তবেরই একটা অংশ। দুঃখ প্রকাশ নয়, শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করাই আমার উদ্দেশ্য। কিন্তু অনুভূতিদের সময় জ্ঞান নেই তারা জানে না কখন কিভাবে নিজেদের মানিয়ে নিতে হয়।
হারিয়ে যাওয়াটা স্বাভাবিক। মনে রাখাটাই আজকের দিনে অস্বাভাবিক। তবুও কিছু মানুষ চিরকাল অমর। শতাব্দিরা পরম যত্নে শব্দদের রেখে দেবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এভাবেই আবার হয়ত আমার মত একসময় আকাশে উড়ে বেড়ানোর সুযোগ পাবে। আর কোন এক সুক্ষ সূচীছিদ্র ক্যামেরা দিয়ে কেউ একজন জীবনের ছবি তুলে যাবেন।
যেখানেই
থাকবেন ভাল থাকবেন।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।