সপ্তদশ শতকে যখন গোটা ইউরোপ জুড়ে প্লেগ মহামারীর আকার নিল তখন প্লেগ নিরাময়ের জন্য বিভিন্ন শহর থেকে ডাক্তারদের নিয়োগ করা হত। ধনী গরিব নির্বিশেষে তারা চিকিৎসা করত। শহরের তরফ থেকে তাদের পারিশ্রমিক দেওয়া হত। এক অদ্ভুত চোঙাকৃতি মুখোশ পড়ে তারা চিকিৎসা করতে বের হত। তাঁদেরকে হিলারও বলা হত। তারা যেন যন্ত্রণা নিরিময়ে ঈশ্বরের দূত হয়ে নেমে এসেছে শহরে। কিন্তু তাদের মধ্যেই কিছু অসাধু ডাক্তার শুধুমাত্র ধনীদেরই চিকিৎসা করত অতিরিক্ত টাকা পাওয়ার আশায়। একবিংশ শতাব্দীতে এসে করোনা যখন অতিমারীর আকার নিল, ঘরের মধ্যে থেকে যাওয়াই যখন নিরাপদ মনে হল তখনও কিছু মানুষ রাস্তায় নেমে এল, মাইলের পর মাইল পার করে তারা নিজেদের নিরাপদ আশ্রয়ে পৌছাবার চেষ্টা করতে লাগল। সেই চেষ্টায় প্রাণ গেল অনেক। রেল লাইনে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রইল দেহাংশ। করোনার থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য হিলার হিসেবে যে লকডাউনকে গত তিনমাস ধরে জীবনের অংশ করে দেওয়া হল আমাদের সেকি সত্যিই আমাদের হিল করতে পারল? নাকি ঘরে বসে আমরা নিউ নর্মালে অভ্যস্ত হতে শিখলাম। নতুন নতুন রান্না শিখলাম। শৈশবের আঁকার খাতা বের করে ঘরবাড়ি আঁকলাম, পুরনো হারমোনিয়ামের ধুলো ঝেড়ে হেঁড়ে গলায় গান ধরলাম, সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজেদের ট্যালেন্টের গুণগান নিজেরাই গাইলাম। উড়োজাহাজ চেপে রোগকে বয়ে আনলাম আমরা, লকডাউনের দামামা বাজিয়ে ভোটের হিসেব করতে শুরু করল সরকার বাহাদুর। শুধু খেতে না পেয়ে, কাজ হারিয়ে হাতের টাকা শেষ হয়ে যাওয়ার পর ওরা যখন ঘরে ফেরার পথে পা বাড়াল তখন প্রতিদিন মৃত্যু মিছিল লেগে রইল গোটা দেশ জুড়ে। আমরা টিভির পর্দায় ডালগোনা কফি খেতে খেতে প্রাইম টাইমে সেই নিউজ দেখলাম শুধু। আর বলতে লাগলাম কে বলেছিল রাস্তায় নামতে? থেকে যেতে পারল না ঘরে কটা দিন? নয় নয় করে প্রায় নব্বই দিন হতে চলল। আর আমরা ওই কুৎসিত কদাকার হাড়হাভাতে লোকগুলোকে বললাম ‘পরিযায়ী শ্রমিক’। নিজের দেশে থেকে ওরা নিজেরাই পরিযাই। ভাবা যায়!
#পবিত্রপাপিস এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের মুখের ওপর সবচেয়ে বড় চপেটাঘাত। আয়নার কাছে মাথা নিচু করে দাঁড় করিয়ে দেওয়া শাস্তি। যদি শুধুমাত্র এই সিরিজের আস্থেটিক ভ্যালু নিয়ে কথা বলা যায় তবে এই সিরিজ একটা সোশ্যাল কমেন্ট্রি, পরিচালক ও লেখকের রাজনৈতিক ও সামাজিক বোধ থেকে। যে কথাগুলো আমাদের সবার বলা উচিত ছিল ঠিক সেইগুলোই কমেন্ট্রি হয়েছে গোটা সিরিজ জুড়ে। এই সিরিজে থ্রিলারের গন্ধ খুঁজতে যাওয়া বোকামো, থ্রিল এখানে শুধুমাত্র আবহ একটা। যার রোমাঞ্চের পরশে পরশে কাঁটার মত আমাদের মগজে এসে খোঁচা দেয় বিবেক। ‘হারবার্ট’এ যেমন গোটা সামাজিক প্রেক্ষাপটটা রচনাই করা হয়েছিল এই কারণে যাতে সমস্ত রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোকে পেশ করা যায়। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ ঘোষণা করা যায়। ঠিক তেমনি #পবিত্রপাপিসএ থ্রিল আসলে ব্যাকড্রপের অংশমাত্র যা আপনাকে স্ক্রিনের সামনে বসিয়ে রাখতে বাধ্য করবে এই কারণেই যাতে আপনি গোটা সিরিজ জুড়ে রাজনৈতিক বক্তব্যগুলোকে শুনতে পারেন। এবং শুনে অনুভব করতে পারেন আপনার রাজনৈতিক স্ট্যান্ড কী হওয়া উচিত। পরিচালক বারবার আয়নার মত সময় ও সমাজের মুখাবয়ব আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন এই কারণেই যাতে এই সময়ের চিত্র ও আমাদের অবস্থান তোলা থাকে আগামীর জন্য। আগামী এসে যাতে বুঝতে পারে আমরা কীসের কীসের হিসেব রেখেছিলাম আর কীসের কীসের থেকে লুকোনোর জন্য বেঁচে নিয়েছিলাম লকডাউনের গৃহবন্দী জীবদ্দশা।
স্টিভেন সোদারবার্গ তার ‘আনসেন’ ও ‘হাই ফ্লাইং বার্ড’ শ্যুট করেছিলেন আইফোনে। ভারতবর্ষে আইফোনে শ্যুট করা প্রথম ছবি কমল সারো মুনির ‘আদাদেও’। কিন্তু একটা গোটা মিনি সিরিজ? হ্যাঁ #পবিত্রপাপিস শ্যুট করা হয়েছে আইফোনে এবং এই লকডাউনের সমস্ত নিয়মকানুন মেনে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এখানে চরিত্ররা কেউ কারোর মুখোমুখি হয়না। সামনে থেকে দেখে না কেউ কাউকে। ভিন্ন ভিন্ন শহরে গৃহবন্দী রয়েছে সব চরিত্ররা। কিন্তু টেকনোলজি তাদের একে অপরের সামনে নিয়ে আসে। একে অপরকে নিজেদের চিন্তাভাবনা প্রকাশ করার সুযোগ করে দেয়। সুযোগ করে দেয় যাদের দায়ভার কেউ নিল না তাদের হয়ে আওয়াজ তোলার, তাদের বঞ্চনার বদলা নেওয়ার। লকডাউনের মধ্যে কলাকুশলীদের অনুপস্থিতে এই সিরিজ যেভাবে শ্যুট হয়েছে তা আগামী দিনে ভিস্যুয়াল মিডিয়ার জগতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে চলেছে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। পঞ্চাশের দশকের পরে টেকনোলজির ইনভেনশন যেমন ছবি করার সংকল্পকে অনেক বেশি সহজলভ্য করে দিয়েছিল, আগামী দিনে টেকনোলজির এই নতুন ব্যবহার ভিস্যুয়াল গণমাধ্যমকে এক নতুন উচ্চতায় শিখরে নিয়ে যাবে সে আশা করাই যায়।
আসলে প্রতিটা মৃত্যুই পোয়েটিক। তার ঘ্রাণ, গন্ধ এমনকি বীভৎসতা নিয়েই দুকলম লিখে ফেলা যায় অনায়াসে। কিন্তু সব মৃত্যুরই কি পোয়েটিক জাস্টিস হয়? যদি না হয় তবে সেই জাস্টিস দেবে কে? জর্জ ফ্লয়েডের মৃত্যু দেখে আমি কান্নায় ভেঙে পড়ি যখন তখন আপামর আমেরিকাবাসী রাস্তায় নেমে আসে জাস্টিস চেয়ে। বিনু কে যারা গুলি করে মেরেছিল, সেই মৃত্যুর জাস্টিস চেয়েই তো মৃত হারবার্ট বিস্ফোরণ ঘটায় শ্মশানে। কার্ল মার্ক্স যে শ্রেণীহীন সমাজের কথা বলেছেন বারবার, যে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্টা করতে চেয়েছিলেন উনি এই গল্পের কেএম ও কী তার প্রতিভূ নয়? শ্রেণীর এই বিভেদ ঘোচানোর জন্যই কি সে এই নয়া পন্থা অবলম্বন করেনি? ব্যালেন্স উভয়দিকেই হওয়া দরকার। কেউ বিনা কারণে ট্রেনে চাপা পড়ে মরবে আর কেউ ব্যালকনিতে কফি কাঁপে চুমুক দেবে, এরম তো হওয়ার কথা ছিল না কমরেড! প্রয়োজনে অস্ত্র তুলে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। নিজের অধিকার, স্বাধিকার রক্ষার জন্য অস্ত্রই একমাত্র সম্বল। কমরেড মাও অনেক আগেই বলেছেন ‘বন্দুকের নল ক্ষমতার উৎস’। তাই গোয়েন্দারূপী কেএম একা যে লড়াই শুরু করেছেন সেই লড়াইয়ের অংশীদার কারা হবে? জুলিয়াস সিজার হয়ে লড়াইএর ময়দানে ঝাঁপিয়ে কারা পড়বে? এই সমস্ত উত্তরের ঠিকানা #পবিত্রপাপিস।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।