সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

শুভ মঙ্গল যাদা সাবধান- দ্যা গে লাভ স্টোরি।।

এলাহাবাদ ষ্টেশন থেকে যখন বিবাহ স্পেশাল এক্সপ্রেস ছেড়ে যাচ্ছিল দৌড়ে ট্রেন ধরতে আসছিল দুজন। ট্রেন তখন হুইশেল দিয়েছে, চাকাও নড়ে উঠেছে। সবাই সবাইকে বিদায়বেলায় হাত নেড়ে সৌজন্য প্রকাশ করেছে। সকলেই সেখানে বিবাহের পোশাকের সজ্জিত। কিন্তু সকল বিবাহযোগ্য কাপলদের থেকেও নজর যায় সুপার হিউম্যানের কস্টিউম পরিহিত দুই যুবকের দিকে। হ্যাঁ আপনি ঠিক শুনছেন দুই যুবকের দিকে। এটা প্রথমবার নয় যখন হিন্দি ছবিতে সমকাম এসেছে। কিন্তু যখনই সমকাম ছবিতে এসেছে তাকে নেগেটিভ ভাবে দেখানো হয়েছে। ছবির কমিক রিলিফ হিসেবে বা কাহিনী থেকে একটু রিলিফ দেওয়ার জন্য হাসির উপজীব্য হিসেবে। চরিত্রকে সেখানে সমকামী দেখানোই হয়েছে শুধুমাত্র হাসির পাত্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। সারা সিনেমাহল জুড়ে আমরা সবাই বারবার করে হেসে উঠেছি। এমনকি আমাদের চোখের সামনেও যখন সমকামীদের দেখেছি টিটকিরি দিয়েছি। আড়ালে আবডালে তাদের নিয়ে খোশ গল্প করেছি। কিন্তু সেক্সুয়্যালিটি বিষয়টি ঠিক কি তা কোনদিন জানার বা বোঝার চেষ্টা করিনি। তাই কার্তিক রূপী আয়ুস্মান খুরানা যখন সমাজের ধারক ও বাহকের প্ল্যাকার্ড নিয়ে ঘুরে বেরানো সঞ্জয় ত্রিপাঠীর উদ্দেশ্যে বলে ওঠে যে "my sexuality is my sexuality none of your sexuality" তখন আমরা আলমোড়া ভেঙে উঠে দীর্ঘশ্বাস ফেলি। কেউ কেউ সিটিতে ভরিয়ে দেয় গোটা সিনেমাহল। বলা বাহুল্য শহুরে আধুনিক যুবক যুবতীরা যে সমকামের ট্যাবু থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে, নিজেদেরকে মুক্তমনা করতে পেরেছে কিছুটা হলেও, তা দেখে অন্তত ভালো লাগছে এই ভেবে যে আমার বন্ধুবান্ধব যাদের নিজেদের ভালোবাসার মানুষের পরিচয় দিতে যে দীর্ঘ লড়াই করতে হত তারা আজ একা নয়। অনেক মানুষ অন্তত তাদের পাশে আছে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দেয় চল্লিশোর্ধ্ব দম্পতি যখন তাদের সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে সিনেমা দেখতে আসে এবং তার কানে কানে বলে জাতি ধর্ম লিঙ্গ নির্বিশেষে সকল মানুষকে ভালোবাসা উচিত। সত্যিই তো ভালোবাসা তো এসব দেখে ঠিক হয় না। প্রেম ভালোবাসা যৌনতা সবটাই প্রাকৃতিক। প্রকৃতির সৃষ্টি। সেই  সৃষ্টির বিরুদ্ধে যাওয়া মানে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়া। তাই তো জিতেন্দ্র কুমার ওরফে আমন তার বাবাকে বোঝায় যে মন্ত্র যজ্ঞ এসব কিছু দিয়েই তার নিজস্বতাকে বদলানো যাবেনা।   হোমোসেক্সুয়াল হওয়া ঠিক ততটাই সাধারণ যতটা হেটেরোসেক্সুয়াল হওয়া। কিন্তু যা এই দুইকে সাধারণ ভাবে সমাজের মধ্যে বিচরণ করতে দেয়না তা হল হোমোফোবিয়া। আমরা অত্যন্ত ভাবে হোমোফোবিক। আমাদের ভয়ই হোমোসেক্সুয়াল কাপলদের স্বীকৃতি দিতে বাধা দেয়। তাই আমরা বিভিন্ন পন্থা বেছে নিই তাদের শিক্ষা দেওয়ার জন্য তাদেরকে বদলে ফেলার জন্য। কিন্তু যা প্রকৃতির সৃষ্টি তাকে কী সত্যিই বদলানো যায়? 
নবাগত পরিচালক ও লেখক হিতেশ কেওল্যা তার প্রথম ছবিতেই এমন একটি বিষয়কে বেছে নিয়েছে যার পক্ষে দেশের সর্বোচ্চ আদালত রায় ঘোষনার পরেও আমরা এখনো তা মেনে নিতে পারিনি। আর মেনে নিতে পারিনি বলেই ছবিকে মরালিটির পাঠ দিতে হচ্ছে। অন্য ছবির চরিত্রদের থেকে আলাদা করা হচ্ছে। ছবিকে একটি অন্য তকমায় ভূষিত করা হচ্ছে। কিন্তু এই ছবিও তো আর পাঁচটা ছবির মতই এক এবং অভিন্ন। শুধুমাত্র প্রেমিক প্রেমিকার লিঙ্গ আলাদা বলেই কি এই ছবিও অন্য জঁরের হয়ে যায়? 

হাসির মোড়কে লেখক-পরিচালক ছবির প্লট সাজিয়েছেন। কিন্তু প্লটের কোন সাবপ্লট না থাকায় ছবির গতি বড়ই লিনিয়ার। এবং কোথাও কোথাও বড়ই স্লথ। সংলাপে পাঞ্চ লাইনের বেশি ব্যবহার থাকায় সংলাপ থেকে হাস্যরসটা মাঝেই মাঝেই ওভারলুক হয়ে গেছে। ডবল মিনিং কথার বড় বেশীই প্রয়োগ করা হয়েছে। অথচ যে মড়ালিটির কথা ছবি বারবার বলতে চেয়েছে তাকে সাধারণ ভাবে প্রয়োগভিত্তিক উপায়ে সংলাপে ব্যবহার করলে তা অনেক বেশী গ্রহণযোগ্য হত। 

আয়ুস্মান খুরানা এই সময়ের একজন অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সেই সঙ্গে ব্যাতিক্রমী একজন অভিনেতা। কিন্তু এই ছবির প্রাপ্তি নবাগত জিতেন্দ্র কুমার। ওয়েবে জিতেন্দ্র কুমার ওরফে জিতু ভাইয়া খুবই পরিচিত একটি মুখ। আই আই টি থেকে হিন্দি ছবিতে লিড চরিত্রে অভিনয়ের পথটা অনেক বেশী কঠিন ও অমসৃণ ছিল। কিন্তু পরিশ্রম আর নিজের প্রতি বিশ্বাসই যে লক্ষ্যে পৌছে দেয় জিতেন্দ্র কুমার তার জলজ্যান্ত উদাহরণ। শুভ মঙ্গল যাদা সাবধান তাই আর কিছুর জন্য মনে না রাখলেও জিতেন্দ্র কুমারের জন্য অবশ্যই মনে রাখা উচিত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...