আমার তোমাকে
কোনদিনও বলা হয়নি যে ছোটবেলায় আমাদের বাড়ির পাশে এক প্রকান্ড মাঠ ছিল, মাঠের
একপ্রান্তে কোম্পানির কোয়ার্টারগুলো ছিল। লম্বা সার দিয়ে ছয়টা করে কোয়ার্টার থাকত
এক একটা লাইনে। আমাদের সামনেরটা ছিল বাইশ নম্বরের। তখন আবহাওয়ার এরম বেহাল দশা
ছিলনা। ঋতু বলতে আমরা ছয়টাই বুঝতাম। গ্রীষ্মের ছুটিতে যখন সন্ধ্যে হলেই আমার
মফঃস্বলে লোডশেডিং হত আমরা দল বেঁধে গিয়ে ওই কোয়ার্টারের সামনের মাঠে বসতাম। ২২/৩
নম্বরে দেখতাম জানলা সবসময় বন্ধ থাকত। আমাদের তখন অত বয়সও ছিলনা যে কৌতুহল হবে।
কিন্তু যখন প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে হাই স্কুলে গেলাম, যখন ছেলে মেয়ের
মধ্যে তফাৎ বুঝতে শিখলাম তখন জানতে পারলাম ঐ ২২/৩ একজন থাকে যার আমাদের মত স্কুলে
যাওয়া মানা। যার সামনের মাঠে খেলে বেড়ানো বারন। কিন্তু কেন বারণ তা বুঝতে আমাদের আরও কয়েক বছর পেরিয়ে গিয়েছিল। গ্রীষ্মের প্রবল দাবদাহের পর যখন বর্ষা আসত তখন আমরা শীল কুড়োতে যেতাম। আর
তারপর কালোমেঘ কেটে গিয়ে যখন শরতের পেঁজা তুলোর মত মেঘ আকাশে উড়ে বেড়াত আমরা বুঝে
যেতাম পুজো আসতে আর দেরি নেই। কিন্তু পুজো এলেই দেখতাম যে ভোর হলেই পাড়ার ঠাকুমারা
ভিড় করত ২২/৩ এর পিছনের দিকে। ২২/৩ এর পিছনের দিকে একটা শিউলি ফুলের গাছ ছিল।
রাতের আধারে শিউলি ফুটে পরে থাকত ঘাসের ওপর। তখন কোনদিনও মনে হয়নি কিন্তু আজ মনে
হয় একমুঠো শিউলি কি আমি রেখে আসতে পারতাম না ২২/৩ এর সেই ঘরে যার জানলা খোলা হয়না
কোনদিনও?
অক্টোবর
দেখে বেড়িয়ে তোমার সাথে যখন নিশ্চুপে হাটছিলাম তখন এই কথাই মনে হচ্ছিল। আমি না
পারলেও ড্যান কিন্তু পেরেছিল। পেরেছিল কারন সে চেয়েছিল। আজকের এই গতিময় সময়ে যখন আমাদের
জীবনে সবকিছুই দ্রুত গতিতে ঘটে যাচ্ছে আমরা সেসব খেয়ালও করছি না। সম্পর্ক ভাঙা
গড়ার খেলায় মেতে উঠছি, সোশ্যাল মিডিয়ামে নিজেদের ঢেলে প্রচার করছি, সম্পর্ক গড়ার
জন্য মোবাইল অ্যাপের সাহায্য নিচ্ছি। ঠিক সেই সময়ে আমরা কি
কেউ ভেবে দেখি সম্পর্ক কি কেন কিভাবে হয়? অনুভূতির তোয়াক্কা কি করি? আমি আজ এসব
কিছুই জানিনা বলেই মনে হয়। কারন যেমন আজও উত্তর খুঁজে পাইনি ‘সদমা’য় কিভাবে কমল
হাসান শ্রীদেবীর প্রেমে পড়েছিল আর কখনই বা পড়েছিল, ঠিক তেমনি ‘অক্টোবর’ দেখার পরও পাইনি
খুঁজে বরুন কখন বিনীতার প্রেমে পরলো আর কিভাবেই বা পরলো।
অক্টোবর আজকের হিন্দি ছবির জঁর এর থেকে অনেক আলাদা। অক্টোবরের দৃশ্যকল্পের মধ্যে এক কাব্যিক অনুপ্রেরণা আছে। লেখিকা জুহি চতুর্বেদী যেন প্রতিটা দৃশ্যকে পংক্তি হিসেবে রচনা করে এক কবিতার জন্ম দিয়েছেন। যে কবিতা আমাদের কাছে এক পরাবাস্তব ভালোবাসার গল্প বলে যে ভালোবাসার স্বপ্ন আমরা সবাই দেখি। কিন্তু পাইনা। কারন আমরা কেউ ড্যান হতে পারিনা। বলা বাহুল্য হতে চাইনা। নিজের সব কিছুকে বাদ দিয়ে সে কেন শিউলির জন্য সারাদিন হসপিটালে বসে থাকত? যখন সে ভালো করেই জানতো তার আঘাত মারাত্মক। আমাদের জীবনে ভালোবাসার স্পর্শ প্রথম আসে নিজের বাবা মায়ের কাছ থেকে। সেই স্পর্শের মধ্যে কোন মিথ্যে থাকেনা। কিন্তু রক্তের সম্পর্ক থাকে। সেই রক্তের সম্পর্ক থেকে টান আসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু বাইরের কোন মানুষের প্রতি সেই টান কি আমাদের আসতে পারে? পারে, সেই টান অনুভব করাটাই ভালোবাসা। সুজিত তার ‘অক্টোবর’ ছবিতে যেন সেই কথাই বলতে চেয়েছেন। যে টান অনুভব করে ড্যান রাতের অন্ধকারে শিউলি ফুল কুড়িয়ে শিউলির বেডের পাশে রেখে আসত, ঠিক তেমনি সকালে শিউলি সেই ফুলের সুবাশ পেয়ে চেতনা ফিরে পেত, ভালোবাসার ব্যাপ্তি এইটুকুতেই লুকিয়ে থাকে।
সম্পর্কের
রসায়ন যে অনেক ব্যাপ্ত, তা শুধু টিন্ডারে ম্যাচ খোঁজার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় সেই বোধ আমাদের
মনের
অন্তরালে হয়ে থাকলে পৃথিবীটা এত ভয়ানক হয়ে উঠত না। বৈশাখি পয়লায় শহর যখন গরমে
হাঁসফাঁস করছে তখন কিন্তু লেকের ধারে প্রেমের সীমারেখা কেউ টেনে দিতে পারেনি।
কিন্তু আমরা সম্পর্কের সীমারেখা টেনে দিই, ভালোবাসার টেনে দিই। মনের উদারতা কে
ব্যাপ্ত হতে দিইনা। বুঝিনা অপেক্ষার মধ্যেও ভালোবাসা থাকে। শুধুমাত্র ভালোবেসে
যাওয়ার মধ্যেও ভালোবাসা থাকে। যে সম্পর্ক ড্যান আর শিউলির মধ্যে হয়েছিল তার ব্যাপ্ততা
মাপার মত চিন্তাধারা আমাদের নেই। আমরা শুধু শান্তনু মৈত্রের এক হারানো দিনের
বাঁশির সুরে আবেগঘন হয়ে সিনেমা হলের বাইরে বেড়িয়ে জীবনের চাওয়া ও পাওয়ার হিসেবগুলো
করতে ব্যস্ত হয়ে উঠতে পারি। কিন্তু নিঃস্বার্থতাকে মনের মধ্যে প্রবেশ করাতে পারব
না। যে ভালোবাসার পাঠ আমাদের ড্যান দিয়ে যায় তা চিরকাল পরাবাস্তবই থেকে যাবে। কারন
সিনেমা কখনও বাস্তব হয়ে ওঠেনি আমাদের চিন্তাধারায়।
ক্যামেরা
যখন শুধুমাত্র হসপিটালের মধ্যেই ঘোরাফেরা করে, কারোর যখন সেখানে কাউকে কিছুই বলার
থাকেনা, ব্যাকগ্রাউন্ড অডিওগ্রাফি যখন এক বিষাদের সুর বুনে চলে তখন সেই
মুন্সিয়ানার প্রয়োজন হয় লেখক এবং পরিচালক উভয়েরই যাতে করে দৃশ্যের বুনন সেরম হয় যা
আমাদের শুধু দৃশ্যসুখই দেবেনা এক অজানা ভয়ের কথা ভাবাবে ও ভাবতে বাধ্য করবে। জুহি
ও সুজিত দুজনেই সেই মুন্সিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন। ভালোবাসার এই অদ্ভুত গল্প বলতে বসে সুজিত সেই দিনগুলোতে হয়ত নিয়ে গেছেন যখন
মানুষের মধ্যে এত পাওয়ার হাহাকার ছিলনা, দিয়ে যাওয়ার মধ্যেই আমরা আনন্দ পেতাম। সেই সুদিন ফিরে আসবে কিনা জানিনা কিন্তু
‘অক্টোবর’ শীতের আগে কুয়াশা পরা ঘাসের ওপর শিউলি ফুলের সুবাস রেখে যাবে। যার ফলবশত
আবার কোন একদিন কোন এক যুবক তড়িঘড়ি নতুন জামা পরে তৈরি হয়ে তোমার মাথার পাশে এক
মুঠো শিউলি ফুল রেখে আসবে।।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।