সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মুক্কাবাজঃ গ্রাউন্ড রিয়েলিটির অন্দরমহল

ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যতার উর্ধ্বে মানবজমিন টেকে না, এ চিরকালের রীতি। কিন্তু ধর্ম যখন অন্ধ হয়, মানুষ যখন শুধু জাতের নিরিখে আলাদা করে, রাষ্ট্র যখন নিয়মবিধি বেঁধে দেয় কে কি খাবে কি করবে তখন সর্ববৃহৎ গণতন্ত্র প্রশ্নের মুখে দাড়িয়ে যায়। আর ঠিক এইরকম পরিস্থিতিতে সবাই যখন মাথা নত করতে ব্যস্ত তখন আমাদের সামনে চলতে শুরু করে প্রায় ২ ঘন্টা ৩৫ মিনিটের ম্যামথ গাঁথা ‘মুক্কাবাজ’।
ছবি শুরু হচ্ছে গৌ-রক্ষকদের নিতি-পুলিশি দিয়ে আর ছবি শেষ হচ্ছে স্ক্রিন জুড়ে লেখা ‘ভারত মাতা কি জয়’ দিয়ে। আর এর ব্যবধানে আমরা ঘুরে আসছি সেইসব অন্তরমহল গুলোতে যেখানে জাতের বিচারে মানুষ বিবেচ্য হয়, যেখানে ট্যালেন্টের থেকেও বেশি প্রয়োজন হয় রেফারেন্সের, কিভাবে ১২০ কোটির দেশে স্পোর্টস রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দালালি করে বেড়ায়, তার ইতিহাসকে। যদিও এই ইতিহাস আমাদের সকলেরই কমবেশি জানা। কিন্তু রূপালি পর্দায় আমরা এতদিন স্পোর্টসএর সেলিব্রেশন দেখতে অভ্যস্ত ছিলাম, আর এবারে পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ দেখালেন স্পোর্টস এর অবহেলা বা ইগ্নোরেন্স। ছবিকে যদি একটা গোত্রের মধ্যে ফেলতে হয় তবে মুক্কাবাজ কেবলমাত্র একটি স্পোর্টস ফিল্ম হিসেবেই স্বীকৃতি পাবে না। প্লটের অভ্যন্তরে এক রোম্যান্টিক গাঁথাও নির্মান আছে। সেই দৃশ্য নির্মানের কৌশল আর স্পোর্টস অর্থাৎ বক্সিং এর দৃশ্য নির্মাণের কৌশল পুরোপুরি আলাদা। পরিচালক বলিউড মেন্সট্রিম্রের সাথে দীর্ঘদিন জড়িয়ে আছেন। তিনি জানেন যখন একটা ছবিকে তথাকথিত মেন্সট্রিম ছবি বলে তিনি প্রচার করছেন তখন তাতেও মেন্সট্রিম এলিমেন্ট আবশ্যক। ছবিতে বক্সিং এর দৃশ্যগুলো, ট্রেনিঙের দৃশ্যগুলো ডকুমেন্টারি ছবির কায়দায় নেওয়া প্রধানত হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরা,  আর রোমান্সের দৃশ্য গুলো তথাকথিত বলিউড রোম্যান্টিক ছবি যেভাবে নেয়, স্লো মোশন ক্যামেরা, নায়কের সাথে নায়িকার চোখাচোখি, যন্ত্রণার উপশম হিসেবে প্রেম, একেবারে সেই কায়দায়। পরিচালকের সুচারু দৃষ্টি ছবির প্রেক্ষাপটকে দুভাবে বিবেচনা করেছে। এক আজকের দিনেও দাড়িয়েও জাতপাত, রাজনৈতিক ক্ষমতা কিভাবে দেশের আর্থ সামাজিক পরিবেশকে চালনা করে, কিভাবে ব্যক্তির স্বাতন্ত্র্য ইচ্ছে ক্ষমতার অঙ্গুলিহেলনের ওপর নির্ভর করে আর দুই এসবের বাইরে এই সমস্তকিছুকে একই যোগসূত্রে নির্মানের সুতো হিসেবে প্রেম।


সুত্র বলছে ভারতবর্ষের সবচেয়ে নীতিভ্রষ্ট রাজ্য উত্তরপ্রদেশ। সেই উত্তরপ্রদেশের এক উদিয়মান বক্সার স্রবন কুমার সিং। বয়স বেড়েছে কিন্তু ট্যালেন্ট দাম পায়নি। আর তার উল্টোদিকে শুদ্ধ শাকাহারি ব্রাহ্মণ কোচ তথা স্পোর্টস মাফিয়ে ভগবান দাস মিশ্রা। আর এদের মাঝখানে স্রবনের প্রেমিকা সুনয়না। উচু জাতের সাথে নিচু জাতের সংঘাত এর লড়াই স্রবন সেদিন শুরু করে দিয়েছিল যেদিন ভগমানের মুখে মুক্কা মেরে বলে দিয়েছিল সে তার ঘরের চাকর নয়, সে স্পোর্টসম্যান। এরপর তারই ভাইঝির সাথে প্রেম আর বক্সিঙে তাঁর ট্রেনিদের টক্কর দেওয়ার চ্যালেঞ্জ। এই কাহিনীর মধ্যে পরিচালক অনেক অণুঘটকের প্রবেশ করিয়ে দিয়েছেন। আজকের সমাজে বিজেপি জয়ত্তর সময়ে চারিদিকে যখন দেশভক্তির মালা জপা হচ্ছে ধর্মের নামে বিভেদিকরনের নামে, জাতেজাতে বিভেদ গড়া হচ্ছে, স্লোগানকে দেশভক্তির মাপকাঠি হিসেবে ধরা হচ্ছে ঠিক সেইসময় যখন সমস্ত মিডিয়া সরকারের নির্দেশ পালন করছে, সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা আইনের গাফিলতির জন্য বিদ্রোহ শুরু করছেন ঠিক সেই একই দিনে এই সমস্ত  নৈতিক বিপর্যয়ের ওপর আরও এক করা প্রহার করছেন পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপ তাঁর ‘মুক্কাবাজ’ ছবিতে।
ছবির প্রথম দৃশ্যের গৌ-রক্ষকরা যখন দুজন মুসলিমকে গরু নিয়ে যাওয়ার অপরাধে গাছের সাথে বেঁধে মারছে ও সেটার ভিডিও নিচ্ছে (সাথে জয় শ্রীরাম ধ্বনি আওড়াচ্ছে, যা ছবিতে নেই, সেন্সরড) এবং তার পরবর্তী দৃশ্যতেই যখন সেই দুজন গোরক্ষককে দেখা যাচ্ছে ভগবান দাস মিশ্রার বাড়িতে কাজ করতে, ঠিক তখনই অকপটে প্রমাণ হচ্ছে দেশভক্তির কড়চা যারা দেয় তাদের অবস্থান। পরিচালক খুব সুচারু ভাবেই ছবির প্রধান ভিলেনের নাম দিয়েছেন ভগবান, যে আবার ব্রাহ্মণ। সমাজের বিভেদিকরনের ওপর যে একটা গোটা দেশ দাড়িয়ে আছে, যার জোর মুক্কাবাজের মুক্কার থেকেও বেশি, তারই প্রতিফলন প্রতিটা দৃশ্যে ধরা পড়েছে।
ছবির সঙ্গীত এবং গান দুইই এই ছবির অন্যতম প্রধান অঙ্গ। মাটির গান অর্থাৎ সময় ও পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্য রেখে গানের কথাক লেখা ও সেই অঞ্চলের সুরের ওপর প্রাধান্য দেওয়া এটা আমরা গ্যাংগস অফ ওসেইপুর থেকে দেখে আসছি।  এই ছবির ক্ষেত্রেও তা প্রধান দৃষ্টি আকর্ষণ করে। দৃশ্যের বুননের ক্ষেত্রে সঙ্গীত এবং গান এক অনবদ্য রোল প্লে করেছে। অনুরাগের ছবির আরও যে একটা প্রধান বিষয় চোখে পরে তা হল ছবির অভিনেতা ও অভিনেত্রীদের অভিনয়। এই ক্ষেত্রেও তার কোন ব্যতিক্রম হয়নি। প্রধান অভিনেতা অভিনেত্রী তো বটেই এমনকি তুলনামুলক কম প্রধান অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয়ও মনে রাখার মত।

পরিশেষে এটাই বলা যায় যে এক ম্যমথ জার্নি শুরু করে যে ছবি, তার শেষ- তথাকথিত ছবির মত বিজয়াল্লাস দিয়ে হয়না। ছবির নায়ক বক্সিং রিঙে নকআউট পাঞ্চে চিৎপটাং হয়ে পরে থাকে, তার বক্সার হওয়ার স্বপ্ন চিরতরে শেষ হয়ে যায় আর এরপর আমরা জানতে পারি ১২০ কোটির দেশে অলিম্পিক মেডেল জেতা দুজনের ওপরই বায়োপিক হয়েছে। কিন্তু যে দেশ এত বিশাল পপুলেশন নিয়েও কেন স্পোর্টসম্যান তৈরিতে ব্যর্থ তার গ্রাউন্ড রিয়্যালিটিটা আমাদের অজানা না থাকলেও জানার পরিসরে আবার নিয়ে আসার জন্য পরিচালককে ধন্যবাদ।

ছবি- মুক্কাবাজ
অভিনয়ে- ভিনিত কুমার সিং, জিমি সেরগিল, রবি কিষাণ, জোয়া হুসেন
চিত্রগ্রাহক- রাজীব রবি, শঙ্কর রমন, জয় প্যাটেল, জয়েশ নায়র।
চিত্রনাট্য- অনুরাগ কাশ্যপ, ভিনিত কুমার সিং, মুক্তি সিং শ্রিনেট, কেডি সত্যম, রঞ্জন চন্ডাল, প্রসুন মিশ্রা।
সঙ্গীত- প্রশান্ত পিল্লাই, নিউক্লেয়া, রচিতা আরোরা।

পরিচালনা- অনুরাগ কাশ্যপ। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

যেদিন বৃষ্টিতে ভিজেছিলাম

                        ওপারেতে বৃষ্টি এল ঝাপসা গাছাপালা,                    এপারেতে মেঘের মাথায় একশো মানিকজ্বালা।                     বাদলা হাওয়া মনে পরে ছেলেবেলার গান,                        বৃষ্টি পরে টাপুর-টুপুর নদে এল বান।                        বৃষ্টির কিছু নিয়ম আছে, সে যখন তখন ঝড়ে পড়ে না। ইচ্ছে হলেও না। অনেকটা ঠিক আমাদের মতন, আমরা যেমন চাইলেও কাঁদতে পারি না সবসময়। কান্নার কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক্লাস এইটে এই বৃষ্টির দিনেই একদিন খুব কেঁদেছিলাম। বিকেলে ...

মণিপুর জ্বলছে! কিন্তু কেন? অন্তিম পর্ব।

  সূচনা। বর্তমান দাঙ্গার সূত্রপাতের কারন হিসেবে যদি কিছু পয়েন্টকে লিস্ট করা যায় তাহলে দাঁড়ায়- বীরেন সিংয়ের রাজনৈতিক কর্তৃত্ববাদ, পোস্ত চাষের বিষয়ে মুখ্যমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান, অনিবন্ধিত অভিবাসন, কুকিল্যান্ডের দাবি এবং মেইতেই পুনর্জাগরণবাদ।  গত বছরের এপ্রিলে বহুদিন ধরে জমে থাকা ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ  জ্বলন্ত উত্তেজনাকে প্রজ্বলিত করে। অসম রাইফেলসের উপস্থাপনায় এই সময়কালকে "সূচনা" হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। সেই মাসে, মণিপুর হাইকোর্ট রাজ্য সরকারকে মেইতেই সম্প্রদায়কে তফসিলি উপজাতির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আবেদনগুলি বিবেচনা করতে বলেছিল-সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী মণিপুরের পাহাড়ি অঞ্চলগুলিতে কুকিদের দ্বারাই বেশিরভাগ সম্পত্তির মালিকানা আছে। 1960 সালের মণিপুর ভূমি রাজস্ব ও ভূমি সংস্কার আইন শুধুমাত্র তফসিলি উপজাতিদের পার্বত্য অঞ্চলে জমি কেনার অনুমতি দেয়। মণিপুরের শীর্ষস্থানীয় উপজাতি নাগরিক সমাজের সংগঠন অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস ইউনিয়ন মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলিতে যেখানে উপজাতি সম্প্রদায়ের আধিপত্য রয়েছে সেখানে "সংহতি মিছিল" করার আহ্বানের দেয়।  ৩রা মে সেনাপতি, উখরুল, কাংপোকপি, ত...

নিয়তির কাছে যা যা বলার ছিল

নবারুণ সেই কবেই বলেছিলেন- “গাঁড় মারি তোর মোটরগাড়ির, গাঁড় মারি তোর শপিং মলের। বুঝবি যখন আসবে তেড়ে, ন্যাংটো মজুর সাবান কলের। পেটমোটাদের ফাটবে খুলি, ফাটবে মাইন চতুর্দিকে। গলায় ফিতে নেংটি বেড়াল, তার বরাতেই ছিঁড়বে শিকে”। আজ একুশ দিন শেষ হবার ছিল। শেষ হবার আগেই আরও উনিশ দিনের জন্য লকডাউন কার্যকর হয়ে গেল। প্রধানমন্ত্রী এসে বলেছেন সরকার বহু আগে থেকেই এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত ছিল। হয়ত ছিল কিন্তু কীভাবে ছিল সেই প্রশ্ন কি কেউ করেছে? তিনঘণ্টার নোটিশে দেশে জুড়ে সমস্ত রকমের যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে গেল। আমরা আনন্দ পেলাম। এবারে দীর্ঘ ছুটি। ওয়ার্ক ফ্রম হোম। কিন্তু একবারও ভাবলাম না হোমলেস পরিযায়ী শ্রমিকদের কথা। যাদের জন্য আমাদের ঝাঁ চকচকে সুন্দর শহরে এখনও বসন্ত এলে আমরা প্রেমে পড়ি। যত ছ্যাঁচড়া কাজের জন্য হাড়হাভাতে মানুষগুলো গ্রাম ছেড়ে শহরের কোণায় কোণায় আস্তাকুঁড়ে আস্তানা গারতে শুরু করে সেই চল্লিশ দশকের শিল্প বিপ্লবের পরবর্তী সময় থেকে। সত্যজিতের ‘পথের পাঁচালি’র কাশবনের মধ্যে দিয়ে রেলগাড়ি দেখে আমরা দৃশ্য ভাবনার তারিফ করি। কিন্তু রেলগাড়ি ব্যবহারের ইঙ্গিত বুঝতে ব্যর্থ হই। রেলগাড়ি শুধু কাশবনের মধ্য...