সামাজিক পরিসর আমাদের নিয়মকানুনের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ করে। নিয়ম
বহির্ভূত কাজ সমাজের কাছে চক্ষুশূল করে তোলে। কিন্তু কাছের মানুষের কাছে? পরিবারে
কাছে? এবং অতঃপর নিজের কাছে? জাভেদ হাসান আমাদের
কাছে সেই চরিত্র যার সাথে বাস্তবের মিল খুঁজে বের করে আমরা তাকে কোণঠাসা করে দিই।
তার প্রতিভার ওপর জোর না দিয়ে তার সামাজিক অবস্থানের কথা চিন্তা করি। আমরা তার
মূল্যবোধ নির্ধারন করি। মোস্তাফা সারোয়ার ফারুকির ‘ডুব’ সেই গভীর পরিসরের গল্প এনে
বলে যে গল্পে জাভেদ হাসান আমাদের সেই পরিচিত মুখ যার অন্দরমহলের আনাচে কানাচে
আমাদের নজর থাকে। ‘ডুব’ বায়োপিক কিনা সে প্রশ্ন প্রশ্নাতীত। চরিত্রের সাথে মিল না
খুঁজে আমরা যদি চরিত্রের অতলে ডুব দিই তাহলে আমাদের কাছে এক জটিল সম্পর্কের রসায়ন
খুলে যাবে যেখানে বারবার বাবার দেওয়া উপহার ফিরিয়ে দেওয়া মেয়ে বাবার তার গলা শুনতে
চাওয়ার ফোন পেয়ে কেঁদে ওঠে।
ডুব আমাদের ঝা চকচকে এখনকার বাংলা ছবি থেকে খানিক নিস্তার
দিয়েছে। এখানে গল্প শুধু বহমান সময়ের হাত ধরে এগিয়ে চলে। এখানে গল্পের মাপকাঠি
নেই। জাঁকজমকপূর্নতা নেই। ক্যামেরা এখানে শুধু মুহুর্তকে ধরে রাখে না, এক ছান্দিক
গতিতে সে চরিত্রের অতলে ডুব দেয়, তাদের মানসিক স্থিতাবস্থার নিরিক্ষে প্রতিপালন
করে সময়কে। আবার সেই সাথে আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই ইউরোপিয়ান আর্ট হাউস ছবির
স্পেসের কথা যা শহুরে কোলহলের মধ্যে থেকেও অত্যন্ত শান্ত, কোলাহল বর্জিত পরিবেশ। সেখানকার
চরিত্রদের সাথে যেন কোলাহলের কোন সম্পর্কই নেই। তারা যেন সব কিছু থেকে আলাদা। তাই
সবসময় ক্যামেরা তাদের গতিবিধির ওপর নজর রাখে না, সে তার মত বিচরন করে, আমরা শুধু
সংলাপ শুনে অবগত হই সবকিছুর। লং টেক এই ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং সেই সাথে লং শট। অত্যন্ত কম সংলাপ এই ছবির পাওনা। সংলাপের জালে চরিত্ররা নিজেদের চিত্রায়ন না
করে লং টেকে তাদের স্পেস জুড়ে বিচরন, এক্সপ্রেসন এবং তদুপরি স্পেসকে ব্যবহার করে আমাদের
কে বিমুর্ত করে তোলে সময়াঙ্গিক থেকে। ক্যামেরার শিথিল গতি যে ছন্দে এগিয়ে চলে তা
চরিত্রদের মূল্যায়নের সার্থে। পরিচালকের দৃষ্টিভঙ্গি যখন চরিত্র থেকে চরিত্রে
স্থানান্তরিত হয় তখন চরিত্রদের মূল্যায়ন যথার্থ হয়ে পরে। ঠিক ভুলের প্রশ্ন উঠে
আসে। কিন্তু এই ছবির খামতি এইখানেই, চরিত্রদের অন্তরের দ্বন্দ্ব বোঝাতে গিয়ে
পরিচালক চরিত্রদের কোণঠাসা করে দিয়েছেন। নিতুর (অভিনয়ে পার্নো মিত্র) চরিত্রটি
যেটুকু সময় স্ক্রিনে উপস্থিত থাকে ধীরে ধীরে যেন সে দর্শকের চক্ষুশূল হয়ে ওঠে।
সমস্ত ঘটে যাওয়া ঘটনার জন্য তাকেই দায়ী করা হয়। অথচ তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার
পাশাপাশি জাভেদ হাসান কিন্তু তার সাথে গভীর রাতে সিগারেট ভাগাভাগি করেও খেয়েছেন।
সিগারেট ভাগাভাগি করে খাওয়ার দৃশ্যে যতটা বয়সের পার্থক্য শিকেয় তুলে শুধুমাত্র
দুজন মানুষকে তুলে ধরা হয়েছে ঠিক তার আগে তাকে ঘর থেকে বের করে দেওয়ার দৃশ্যে
বয়সের পার্থক্যটা আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হয়েছে। পরিচালক যখন এমন এক গল্প কে বেছে নেন
যেখানকার চরিত্ররা সামাজিক রীতিনীতির তোয়াক্কা করে না, তারা এক কাল্পনিক জগতের কথা
ভাবে তখন ঠিক ভুলের বিচার করার কথা নয়।
বাবা, মেয়ে ও তার মায়ের মধ্যে এক মানসিক দ্বন্দ্ব। যে
দ্বন্দ্ব বাবাকে মেয়ের থেকে দূরে করে দেয় আর মাকে আরও স্বাবলম্বী করে তোলে। ডূব এই
চরিত্রদের অতল গভীর চেতনার রসায়নের কথা বলে। আসলে আমরা রোজনামচায় ভুলে গেছি দূরত্ব
মানুষকে কাছে নিয়ে আসে, আর এই দূরত্বের অন্তিম পর্যায় মৃত্যু, মৃত্যু মানুষকে আরও
নিজের করে দেয়। কারন তখন যেহেতু ইহজগতে তার কোন অস্তিত্ব থাকেনা তাই যা খুশি
অধিকার তার ওপর ফলানো যায়। বাধা দেওয়ার কেউ নেই। জাভেদ হাসানের মৃত্যুর পর ঠিক
সেইভাবেই তার পূর্ব স্ত্রী তার ওপর অধিকার ফিরে পায়। বেডরুমে নিজেদের ফটোফ্রেম
আবার ফিরে আসে।
আগেই বলেছি এই ছবিতে সময়ের মাপকাঠি নেই কোন। তাই সময় কিভাবে
অতিবাহিত হয়ে যায় তা আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়না। আমরা বেশ কিছু পরে বুঝতে পারি আমরা
আসলে বেশ কিছুটা সময় পার করে এসে উপস্থিত হয়েছি। লিনিয়ারিটির ব্রেক করা হয়। একটা সময়কে
মাঝখান থেকে বাদ দিয়ে নতুন সময়ে এসে উপস্থিত হয় দৃশ্য। দৃশ্য এখানে শুধুমাত্র
গল্পের কথা বলে না। দৃশ্য সেইসাথে তার আনুষঙ্গিক দিকও তুলে ধরে। যে অনুষঙ্গে মাঝে
মাঝে দৃশ্যকে অহেতুক দীর্ঘায়িত করা হয়েছে বলে মনে হয়।
সম্পর্ক মানুষের জীবনে উপহার হিসেবে যেমন আসে তেমনি তার চলে
যাওয়াতেও কোন ক্ষেদ থাকার কথা নয়। কারন ভালোবাসা এক এবং অবিনশ্বর। অভিমান থাকে।
‘ডুব’ শুধুমাত্র এই অভিমানটুকুর কথা বলে, কোন ক্ষেদের আশ্রয় সে নেয়না। ডুবের
সাফল্য এখানেই। সে একটা পরিচিত গল্প নিয়ে কাজ করে কিন্তু সেই প্রথাগত মেলোড্রামার
সাহায্য নেয় না। দৃশ্যই এখানে প্রধান। সমস্ত অভিমান যেন সেইই প্রকাশ করে। আবার সব
শেষ হলে সমস্ত অভিমানও যেন তার সাথে সাথে চলে যায়। তাই মেয়েকে বাবার কফিনে আছড়ে
কাঁদতে হয় যে বাবা তো শুধুমাত্র তার গলা শুনতে চেয়েছিল। কিন্তু বাবার চলে যাওয়ার
সাথে সাথে মেয়েরও যে অভিমানটুকু ছিল তা আর থাকে না।
পরিশেষে বলার মত যা পরে থাকে তা ছবির শব্দ ও সঙ্গীত। দৃশ্য
যেমন অনুষঙ্গ তৈরি করে, চরিত্রের অতলে ডুব দেয় ঠিক তেমনি শব্দ ও সঙ্গীত সেই অতল গহীনতায়
চরিত্রদের মাপকাঠি হিসেবে বিচার্য হয়। শব্দ ও সঙ্গীত দৃশ্যকে বাকি অনুষঙ্গ থেকে
বাদ দিয়েছে। দৃশ্যের যে প্রভাব ছবিতে আছে তার আখ্যান রচনা করে শব্দ ও সঙ্গীত। তাই
‘ডুব’ আমাদের রোজকারের ব্যস্ত জীবনে কিছুটা মুক্ত সময় যেখানে নিয়মের বেড়াজাল নেই,
সস্তার মেলোড্রামা নেই, সম্পর্কের প্রতি কোন ক্ষেদ নেই।।
ছবিঃ ডুব
অভিনয়েঃ ইরফান খান, তিশা, রোকেয়া প্রাচী, পার্নো মিত্র
প্রমুখ
পরিচালনায়ঃ মোস্তাফা সারোয়ার ফারুকি।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।