আমাদের ছোটবেলায়
দল বেধে পিকনিক যাওয়ার কোন রেওয়াজ ছিলনা। কারন মফঃস্বল ততদিনে এই শহুরে আদবকায়দা শিখে
উঠতে পারেনি। ভ্যাকেশন বলতেও আমাদের কিছু ছিলনা। ঘুরতে যাওয়া বলতে বুঝতাম প্রতি পাঁচ বছর অন্তর পুরীর সমুদ্র সৈকত। আমাদের গ্রীষ্মের ছুটি
কাটত নন্টে ফন্টে, টেনিদা, ফেলুদা এদের সাথে। অ্যাস্টেরিক্স বা টিনটিন আমাদের দরজায়
কড়া নাড়ত না। আমাদের কোন আলাদা দেশের বাড়ি ছিলনা, আমাদের ঘুরতে
যাওয়ার কোন জায়গা ছিলনা আলাদা করে। তাই ছুটি কাটানোর ব্যাপারটা রপ্ত হয় অনেক পরে
এসে। যখন ক্লান্তি হানা দেয় তখন মনে হয় পালিয়ে যাই কোথাও। এই পালিয়ে যাওয়ার
প্রসঙ্গে এসে বলি যে বাঙালির ছুটি কাটানোর প্রবণতা বিশাল। আসলে ছুটি কাটানো নিত্য
জীবন থেকে কিছুটা রেহাই পাওয়ার আশ্বাস। একটু জল বাতাস পেয়ে নিত্যকার ক্লান্তি
কাটিয়ে ফিরিয়ে আসা। এই ছুটি কাটানোর অন্যতম প্রধান স্থান একসময় ছিল পশ্চিম।
সিমুলতলা, মধুপুর, পালামৌ এবং ম্যাক্লাক্সিগঞ্জ। শেষের নামটা পড়লেই বোঝা যায় একটা
বিদেশী ফিলিং আছে। ১৯৩২ সালে যখন আরনেস্ট টিমোথি ম্যাক্লাক্সি ২০ টা পরিবার নিয়ে
বর্তমান ঝাড়খণ্ডের অন্তর্গত এই ম্যাক্লক্সিগঞ্জ বানালেন, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের
পর একেবারে ফাকা হয়ে গেল এবং তারপর থেকে বেশ কিছু এলিট বাঙালিদের ছুটি কাটানোর এক
অন্যতম ডেসটিনেশন হল।
এই
ম্যাক্লাস্কিগঞ্জেই দেখি ১৯৭৯ সালে এক পরিবার আঁকাবাঁকা পথ পেড়িয়ে আকাশী
অ্যাম্বাসেডার নিয়ে ছুটি কাটাতে যাচ্ছে। ঠিক যেমন ৭০ সালে চার বন্ধু পালামৌ এর
জঙ্গলের পথ দিয়ে যাচ্ছিল। দুটি গল্পের ধরনই এক। কিন্তু তার নির্যাস আলাদা। যে
নির্যাস একটা সময়কে বাঁধিয়ে রাখে। ম্যাক্লাক্সিগঞ্জে পরিবারের সবাই একত্র হয়ে যে
মজায় মেতে উঠে সেই মজা চরিত্রদের ব্যাখ্যা দিতে নারাজ। তাদের ভূত ভবিষ্যৎ এর হিসেব
রাখেনা। সাতটা দিন শুধুমাত্র সাতটা দিন ও রাতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। পর্দার গল্প
পর্দাতেই শেষ হয়ে যায়। শুধু যে নির্যাস টুকু পরে থাকে তা এক রিদেমিক টোনাল বিউটির
দিকে নিয়ে যায়। যেখানে গল্পের আর কোন প্রয়োজনীয়তা নেই। শুধু ঘটে জাওয়া কিছু
মুহূর্ত স্মৃতির পর্দায় আবছা হয়ে থাকে। তাই “আ ডেথ ইন দ্যা গঞ্জ” এ ডেথটা আবশ্যিক
নয়, চরিত্ররা আবশ্যিক। তাদের কথোপকথন আবশ্যিক নয়, তাদের স্ক্রিন প্রেজেন্সটাই
আবশ্যিক। এই যে কিছু না ঘটে যাওয়া গল্পের মধ্যেও যে কিছু ঘটে যাওয়া এলিমেন্ট থাকে,
এই এলিমেন্ট হয় ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এক অন্য বাস্তবকে সামনে নিয়ে আসে নয়ত চুপচাপ
গল্পের বহমানতার অতল জলের মধ্যে ধীরে ধীরে ডুবে যায়। “আ দেথ ইন দ্যা গঞ্জে”
এইধরনের ব্যাকগ্রাউন্ড কোন এলিমেন্ট নেই যা এক কঠিন বাস্তব এর কথাও বলে। এখানে যে
এলিমেন্ট আছে তা এক নিছক ছান্দিক কাব্যিক আড়ম্বরতা ছাড়া কিছুই নয়। দৃশ্যের গঠনে যে
রিয়েলেস্টিক শৈলী আছে, তা গল্পের আড়ম্বরতায় নেই। শুধু আছে এক মানসিক অনাড়ম্বর
অ্যাপ্রোচ। যে অ্যাপ্রোচ ধীরে ধীরে একজনকে সকলের থেকে আলাদা করে দেয় আর শেষে নিয়ে
আসে মৃত্যুর কাঠগড়ায়। সময়ের প্রেক্ষাপট বিচার করলে যে বাস্তব আসার কথা সেই বাস্তব
অবর্তমান, তার জায়গা দখল করেছে মানুষের সহজাত নেচার, স্বার্থপরতার বিষ, বিশ্বাসঘাতকতার
ঔরস।
নবাগত
পরিচালক কঙ্কনা সেনশর্মার কৃতিত্ব এটাই যে তিনি এক কিছু না ঘটা গল্পকে পর্দায়
এনেছেন এবং দৃশ্যের শৈলী দিয়ে, ঘটমান সময়ের বহমানতা দিয়ে, অভিনেতা অভিনেত্রীদের
প্রেজেন্স দিয়ে গল্পের সত্তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এক মানসিক স্থিতিশীলতার বিপ্রতীপে
গিয়ে মানুষের সহজাত চেতনাকে অনুধাবন করে পুরনো বন্দুকের নল থেকে নির্গত বুলেটের
বেগকে মাপবার কোন চেষ্টা করেননি, শুধু গাছের ছালের ওপর লেগে থাকা রক্তের দাগকে
সাক্ষী রেখে বলেছেন যে বিশ্বাসের আশ্বাস কতটা নিষ্ঠুর।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।