পিকু
নিয়ে বাড়বাড়ন্তের শেষ নেই। ঠিক যেমন দুদিন আগে ‘ওপেন টি বায়স্কোপ’ নিয়ে ছিল। এই
বাড়বাড়ন্তের অন্যতম কারন হল ‘নস্টালজিয়া’। দুটি ছবিই বাঙালির নস্টালজিয়ার অন্যতম
উদাহরন। আর সেই উদাহরন দিচ্ছেন দুইক্ষেত্রেই একজন। সুজিত সরকার। প্রথম ক্ষেত্রে
পরিচালক এবং দ্বিতীয় ক্ষেত্রে প্রযোজক।
পিকু
বাঙালির অন্দরমহলের কথা বলে। এক বৃদ্ধ বাবা আর তার অবিবাহিত মেয়ের গল্প। যেখানে
মেয়ে লিবারেল এবং স্বয়ংভর। লিবারেল এর পরিমাপ করা হয় এটা বুঝিয়ে যে মেয়ে নিজের
প্রয়োজনমত শারীরিক চাহিদা অনুযায়ী যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়। সে আধুনিক, তার কাছে যৌনতার
আধুনিক সংজ্ঞা শারীরিক চাহিদা ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু ছবির শুরু থেকে যে জাতিকে
তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা করা হয়েছে এবং
বারবার বিভিন্ন উপায়ে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে আপনি আদ্যন্ত একটা বাংলা ছবি দেখতে
বসেছেন শুধুমাত্র ছবির ভাষাটা হিন্দি, সেই ছবিতে রিটায়ার্ড সরকারি কর্মচারী (
অফিসের যে ঠিকানা ‘বাবা’ কে ‘মেয়ে’ বলেছিল তা থেকে অনুমেয়) বাবার কাছে মেয়ের এই
আধুনিকতা গোপন থাকে না এবং এতে বাবার সম্মতিও থাকে এবং তিনি অন্য লোককে বলে
বেরাতেও পিছপা হননা। তাহলে কি বাঙালিরা এতটাই লিবারেল হয়ে গেছে যে রবিবারের বিকেলের
পারিবারিক আড্ডায় আজকাল যৌনতা নিয়েও আলোচনা করতে কেউ পিছপা হননা। কিন্তু এই
বাঙালিই তো এখনও লেসবিয়ান, লিভ-ইন ইত্যাদি শব্দ গুলো শুনলে নাক কুঁচকায়। রাতের
অন্ধকারে দরজায় উঁকি মেরে দেখে ছেলে বা মেয়ে কম্পিঊটারে কি দেখছে। তাহলে কি
লিবারেলিটি নির্ভর করে জায়গা/স্থানের ওপর? ভাস্কর ব্যানার্জি দীর্ঘ চাকুরীজীবন
অবধি উত্তর কলকাতার অলিগলিতে কাটিয়েছেন, তার পূর্বপুরুষের এক বিশাল অট্টালিকা
রয়েছে যা থেকে সহজেই অনুমান করা যায় যে দীর্ঘ কয়েক শতাব্দী ধরে তারা এই শহরে বসবাস
করছে, কিন্তু বার্ধক্যের সময়ে মেয়ের চাকুরির জন্য দিল্লিতে সেটেল হয়ে কি তার
উত্তরণ হয়েছে? যে উত্তরনের ফলে তিনি অনেক বেশী লিবারেল হয়ে গেছেন। মনে হয় না। মনে
হওয়ার মতন কারণও নেই। তিনি তার দীর্ঘদিনের বসবাসের জায়গা বদল করেছেন, আত্মীয়
বন্ধুদের ছেড়েছেন এবং চিরকালীন বাঙালিদের মতন প্রথাগত এক রোগ (বলা ভাল ‘অভ্যাস’)
এর শিকার হয়েছেন। এর ফলে তিনি একাকীত্ব অনুভব করছেন। আর সেই জন্যই তিনি নতুন
যায়গায় এসে মেয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন।
এটা খাটি
কথা বার্ধক্যে এসে অনেক বাবা মায়েরাই তাদের সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পরেন। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রে তারা চান ছেলে বা মেয়ে অন্য কারোর সঙ্গ না পাক। কারন এতে
ছেলে বা মেয়ের কাছে তাদের পজিশন নেমে
যাওয়ার সম্ভবনা থাকে। ভাস্কর ব্যানার্জি এই দলের মধ্যেই পরেন কারন তিনি এর জন্য মেয়ের
নামে কুৎসা রটাতেও পিছপা হন না। সেটা হতে পারেই। ব্যক্তিবিশেষে চিন্তাভাবনার
বিস্তর ফারাক থাকে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে ভাস্কর ব্যানার্জি শুধুমাত্র একজন
ব্যক্তিবিশেষ নন। পুরো ছবি জুড়ে বারবার করে আমায় আঙুল দিয়ে দেখানো হয় তিনি একটা
জাতিকে রিপ্রেসেন্ট করছেন। তার আচার ব্যবহার, আনুষঙ্গিক কথাবার্তা সমস্ত কিছুই
বারবার দাবী করে তিনি একজন রিপ্রেজেন্টর। পরিচালক খুব বুদ্ধিমত্তার সঙ্গেই বাঙালির
চারপাশটাকে ছবিতে নিয়ে এসেছেন এবং চরিত্রের নামও বেচেছেন এমন যার সাথে আমাদের
পূর্ব পরিচয় আছে (‘আনন্দ’ ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের বাঙালির ভুমিকায় অভিনয় করা
চরিত্রটির নামও ছিল ‘ভাস্কর ব্যানার্জি’)। ছবির সুরকার থেকে শুরু করে ছবির গানের
কথায় বাংলা শব্দ ব্যবহার করে বারবার বুঝিয়ে দেওয়া হয় ‘পিকু’ একটি বাংলা ছবি এর
চরিত্ররা আদ্যন্ত বাঙালি এবং তারা শুধু বাঙালি হিসেবেই ছবিতে নেই তারা গোটা একটা
জাতির গল্প তুলে ধরছে। ভারতবর্ষের অনান্য প্রান্তের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে
একজন বাঙালি হিসেবে। তাই ছবিতে ফুটে উঠছে ‘বেনারস’ , ‘হাওড়া ব্রিজ’, গঙ্গার ঘাট,
উত্তর কলকাতা।
পরিচালক
নিজে বাঙালি হওয়ায় তার একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব ছিল ছবিটার প্রতি। যেভাবে তিনি
বাঙালিদের প্রতিফলিত করলেন আদতে কি সত্যিই তারা তেমন? সত্যিই কি আমরা পারি দীর্ঘ
সময় পর নিজের ভিটেতে ফিরে এসে আবেগঘন হয়ে সর্বসমক্ষে বলতে ‘ঠিক এই যায়গাটায় আমার
বাবার মৃতদেহটা রাখা ছিল’। এটাই কি নস্টালজিয়া? এটাই কি নস্টালজিয়ার প্রকৃত
উদাহরন? আমার কাছে নয়। আমার কাছে নস্টালজিয়া ক্রমাগত বদলে যেতে থাকা আমার শহরটা।
আমার কাছে নস্টালজিয়া যে সময়টা আমি ছিলাম সেই সময়ের অবক্ষয়। কারোর মৃত্যু আমার
কাছে শোক। কাউকে হারানোর দুঃখ। তা আর যাই হোক না কেন নস্টালজিক হয়ে পরে সবার সামনে
ঘোষণা করবার মত বিষয় নয়। ‘পিকু’ ঠিক এইসব যায়গাতেই বাঙালির চিন্তাভাবনাকে, আবেগকে
ভাস্কর ব্যানার্জির মধ্যে ইনপুট হিসেবে প্রবেশ করিয়ে দিতে পারেনি। তাই আদ্যন্ত
বাঙালি আমেজকে ধরবার যে প্রচেষ্টা করা হয়েছিল তা সর্বতভাবে সাফল্য পায়নি। যা কিনা
অনেক আগাই পাওয়ার কথা ছিল। হ্যাঁ অন্তত বাংলা ভাষায় ছবি করিয়েরা অনায়াসেই করতে
পারত। ঠিক যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে ইরানের চলচ্চিত্র তার দেশের মানুষদের রিপ্রেজেন্ট
করে আসছে।।
ছবিঃ- পিকু
অভিনয়েঃ- অমিতাভ বচ্চন, দীপিকা পারুকন, ইরফান খান প্রমুখ।
সঙ্গিতঃ অনুপম রায়।
পরিচালনায়ঃ সুজিত সরকার।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।