অভিজিৎ বাবু,
মৃত্যু সবসময়ই আমাকে দুর্বল করে
দেয়। সেটা প্রতিটা সহানুভূতিশীল মানুষেরই হওয়া উচিত বলে আমার ধারণা। কিন্তু প্রশ্ন
ওঠে সহানুভূতি কি পরিবর্তন আনতে পারে? পারে কি সেইসব মৃত মানুষদের কাছের মানুষের
দুঃখকে দূরে সরিয়ে রাখতে? পারে কি অন্যায়ের বিরুদ্ধে গণজাগরণের আওয়াজ তুলতে? হয়ত
পারে আর পারে বলেই গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি রাতে আপনার অর্থাৎ সাহিত্যিক অভিজিৎ রায়ের
মৃত্যুর পর বাংলাদেশ ছাড়াও পৃথিবীর অন্যান্য দেশে প্রতিবাদের আওয়াজ উঠেছে। আপনাকে
সর্বসমক্ষে হত্যা করার অপরাধে হত্যাকারীকে কঠোরতম সাজা দেওয়ার দাবী উঠেছে। বলা
বাহুল্য ন্যায্য দাবী। কিন্তু এসবের মাঝে আমার ভুমিকা কি? আমি অভিজিৎ রায়বাবু কে
চিনতাম না। তার মৃত্যুর খবর পেয়ে আমি তাঁকে চিনি। তখন আপনার ফেসবুক পেজ এ যাই এদিক
ওদিক ওলটাই পাল্টাই। আপনার সম্বন্ধে জানা শুরু হয়। পরিচয় হয় আপনার নিজের ব্লগ
‘মুক্তমনা’ এর সাথে। আপনার বেশ কিছু বইয়ের কভার ফটো দেখি কয়েকটার ভুমিকা পড়ার
সুযোগ হয়। ব্যাস এইটুকুই এর বেশি আমি আর কিছুই আপনার সম্বন্ধে জানি না। এইসব জানতে
জানতেই ভোর হয়ে এসেছিল। আমায় শুতে হত। ঘুম হয়ত পাইনি তখনও, কিন্তু ক্লান্ত ছিলাম।
ক্লান্তিটা কাটানোর দরকার ছিল। সময় বলছিল এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে, কিন্তু প্রতিবাদের
মাধ্যমটা কি হবে আমি তখন বুঝতে পারেনি। আমার কবিতার খাতা খোলা ছিল কিন্তু তাতে
শব্দ আঁকতে অক্ষম হয়ে পরেছিল আমার কলম। কিছু কিছু ঘটনা মাঝে মাঝে শব্দদেরও নির্বাক
করে দেয়। কিন্তু আমার ফেসবুকের দেওয়ালে তখন প্রতিবাদের গর্জন শোনা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে বন্ধুরা জানাতে শুরু করেছে পরদিন তারা রাস্তায় নামছে। সরকারকে ২৪
ঘণ্টা সময় দিচ্ছে হত্যাকারীকে আটক করবার জন্য। আমার মোবাইলের মেসেজ জানাচ্ছে আমার
ইউনিভার্সিটিও একটা পদক্ষেপ নিতে চলেছে পরদিন। তারাও পথে নামছে, তারাও নাকি
বাংলাদেশের হাই কমিশনর কে চিঠি লিখবে এই মর্মে। এতদিন যারা পার্শ্ব শিক্ষক, SSC এর পরিক্ষায় পাশ করেও চাকরি না পাওয়া মানুষদের এবং বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং
কলেজ গুলোর শিক্ষকদের আন্দোলনে সর্বক্ষণের সঙ্গি ছিলেন তারাও প্রতিবাদের ডাক
দিয়েছে। আমার এবারে একটু ভালো লাগছে, ঘুম আসছে। হয়ত ঘুমিয়ে পরব এক্ষুনি।
ঘুম ভাঙার কথা ছিল যে সময়ে তার
অনেক আগেই উঠে পড়েছিলাম। মনে মনে ঠিক করেছিলাম চুপচাপ থাকব। কিন্তু হল না। প্রয়োজন
প্রয়োজনীয়তাকে ছাপিয়ে উঠল। আমার বেরনোর ছিল। এই অসময়য়ের গরমে ঘেমে ভিজে ওঠার দরকার
ছিল। ১৫ মিনিট আগে না পৌছালে মাসের টাকাটা হয়ত পাওয়া যাবে না। টাকা পাওয়া না গেলে
এই মাস চলবে না। অনেক গুলো টাকা ধার হয়ে আছে। তাই সেদিন আর চুপচাপ থাকা হয়নি।
হ্যাঁ অভিজিৎ বাবু আপনার মৃত্যু আমাকে যে গভীর ভাবে আঘাত করেছিল আমি সেটা বেশিক্ষণ
বয়ে বেরাতে পারিনি। যেমন পারিনি আমার সবেচেয়ে কাছের মানুষের চলে যাওয়ার ঘটনাকে।
আমাকে এই শহুরে কলাহলের মধ্যেই বাঁচতে হবে আমাকে আমার নিজেরটা নিজেকেই জোগাড় করে
নিতে হবে। যে দুজন মানুষ আমার বাড়িতে আছেন তাদের দেখভাল করতে হবে। আপনার হয়ত
বিশ্বাস হবে না কিন্তু তবুও শুনুন আমি যদি সেদিন আপনার মৃত্যুর জন্য ভারাক্রান্ত
হয়ে চুপচাপ ঘরে থেকে যেতাম তাহলে ওই সামান্য কটা টাকাও আমার পাওয়া হত না। আর পাওয়া
না হলে আজকে বাবার অসুস্থতার খরচ আমি জোগাতে পারতাম না। আমি জানি আপনি ভেবেছিলেন
এবং ভেবেছিলেন বলেই ধর্মান্ধতার গ্রাস থেকে আমাদের মুক্ত হওয়ার উপায় বলতে থেকেছেন।
আপনি হয়ত ভেবেছিলেন আপনার লেখা, আপনার চিন্তাভাবনাই আমাদের পরিবর্তন করতে পারবে।
আপনার এই কাজকে অবশ্যই সাধুবাদ। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি আজ আর মনে করি না আমি
কিছুর পরিবর্তন করতে পারব। সে ক্ষমতা আমার নেই। ক্ষমতা থাকলেও উপায় নেই। হ্যাঁ আমি
এখন নিজ কেন্দ্রিক হয়ে পড়েছি। নিজে কিভাবে থাকব সেটা নিয়েই ভাবতে ব্যস্ত রয়েছি। যখন
প্রতিভা থাকা সত্তেও ধারদেনা করে চলতে হয়, যখন সবসময় ভবিষ্যৎ টা অন্ধকার দেখায় তখন
এইসব পরিবর্তনের ভূত আর মাথায় থাকে না। কারন আপনি হয়ত নিশ্চয়ই জানবেন যারা করতে
চায় তারা পারে না আর যাদের কাছে ক্ষমতা আছে তারা কিছু করে না। তাই একসময় যখন আমিও
ভেবছিলাম সমস্ত অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলব, সময় সেটা করতে দেয়নি।
আমাকে ভয় দেখানো হয়েছিল আর আমি ভয় পেয়ে সব কিছু ছেরে দিয়েছিলাম। আপনার মত সাহস
আমার হয়নি। আমার মাথার এমন কোন মুকুট নেই যে অকস্মাৎ আক্রমন থেকে কেউ আমাকে এসে
রক্ষা করবে।
মানুষ আজ দাসে পরিণত হয়েছে সে কথা
স্বীকার করে নিচ্ছি। চারিদিকে কি ঘটছে তা নিয়ে তাদের কোন ভ্রুক্ষেপ নেই। তাদের
উপার্জন তারা কিভাবে বাড়াতে পারবে তাই নিয়েই তারা সর্বক্ষণ চিন্তা করতে ব্যস্ত।
দেশ, সমাজ, প্রতিবেশী, মানবতা এই শব্দ গুলির অর্থ অধিকাংশ মানুষের মননেই আর নেই। আবার
কিছু কিছু মানুষের মনে অধিকতর মাত্রায় আছে। দুটো শব্দ খরচ করে তারা ভেবে ফেলে অনেক
বড় কিছু করে ফেলেছে। বাইরে থেকে হয়ত খবর নেওয়া যায়। সমর্থন বা অসমর্থন করা যায়।
কিন্তু পথে না নামলে সেই পথের হাল হকিকত বোঝা যায়না। তাই মিছিল, মিটিং, গণ
অভ্যুত্থান, অবস্থান, বিক্ষোভ এইগুলি সবই প্রতিবাদের মাধ্যম। এগুলি ছাড়া কোনভাবেই
আমরা আমাদের ভাষা সকলের কাছে পৌছে দিতে
পারিনা। সংস্কৃতি করে প্রতিবাদ আজ অবধি হয়নি। সেটায় কোন এক ব্যক্তির নিজের
চিন্তাভাবনা ব্যাপ্ত হয়েছে। জন সমষ্টির মধ্যে তার চিন্তাভাবনা প্রসার ঘটেনি। আর
সেই জন্যই হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দারের পরও ঠিক একই ভাবে আপনাকেও মারা যেতে হল
অভিজিৎবাবু।
কিন্তু এসব সত্তেও এখনও কিছু
মানুষ বেঁচে আছেন যারা এই ধরনের মৃত্যুর ঘটনায় বিব্রত হয়ে পড়েন। অনেক কিছু করবার
কথা ভাবেন। কিন্তু কিছু করতে পারেন না কারন সব শেষে তাদের নিজেদের কথা ভাবতে হয় আর
ভাবতে হয় এ মাসেও ধারের পরিমানটা অনেকটা বেড়ে গেল। তবুও সেটা শোধ করার কোন মাধ্যম
পাওয়া গেল না। কিন্তু এই মানুষগুলিই যদি কোনদিন সুযোগ পায় তাহলে তারা তাদের
প্রতিবাদের ভাষা ঠিক গড়ে যাবে।
আমার গর্ব হয় আমি আমার চারপাশে
কিছু মানুষকে দেখি যারা এই দলের মধ্যে পড়েন। সস্তায় নিজের নাম কুড়োনোর পক্ষপাতি
এরা নন। তাই অভিজিৎ বাবু আপনি হয়ত ভুল বুঝতে পারেন যে আমরা কোন শোরগোল না বাধিয়ে
আপনার হত্যার বিরুদ্ধে চুপ করে আছি কেন?
চুপ করে জানলা ধরে ঘন্টার পর ঘণ্টা দাড়িয়ে থেকে নিজের মনের মধ্যে নিজে
জ্বলতে থাকাটাও প্রতিবাদ করা। অনন্ত পথ হেঁটে যাওয়াতেও একরাশ দুঃখের ছবিই ফুটে
ওঠে। আমরা যারা শাহবাগের সময় উদ্বিগ্ন ছিলাম আমরা যারা বারবার খোঁজ খবর নিচ্ছিলাম
পরিবেশ পরিস্থিতির তারা আজও আপনার চলে যাওয়াতে সমান ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত। তারা আজও
ঠিক ততটাই হতাশাগ্রস্থ ঠিক যতটা শাহবাগের সময় রাজীব হায়দারের মৃত্যুতে হয়েছিল। তাই
হয়ত এই দলটায় আকার খুব বড় না হওয়ায় কোন মিছিল বের হয় না, কোন অবস্থান হয় না কিন্তু
শহরের প্রতিটা আনাচে কানাচে এরা অনবরত আপনাকে নিয়েই আলোচনা করতে থাকে। আর কোথাও না
পারুক নিজেদের মধ্যেই নিজেরা নিজেদের ক্ষোভ, হতাসা, রাগ উগড়ে দেয়। আর কখন যেন আমিও
এদের দলে ঢুকে পরি।
আমরাও চাই একটা ঝড় উঠুক। কেউ একজন
দাঁড় বেয়ে নিয়ে চলুক আমাদের সুন্দর সমাজের দিকে আমরা তার সঙ্গি হতে রাজি। পথে যতই
বিপদ আসুক আমরা রাজি সমস্ত বিপদ কে এড়িয়ে যেতে। কেউ একজন পথ দেখাক যে পথে গেলে হয়ত
আমরাও আপনার মত মুক্তমনা হতে পারব। আমরাও গভীর ভাবে সেই পথের অপেক্ষাতেই আছি। যদি
নিজেদের ক্ষমতা থাকত তাহলে হয়ত নিজেরাই এগিয়ে যেতাম। পিছুটান মুক্ত হতে পারিনি
এখনও। আঘাত পাওয়ার ভয় আমাদের এখনও আছে। তবুও এখনও বিদ্রোহী আত্মা মরে যায়নি,
আগুনের লেলিহান শিখার মত মাঝে মাঝে সে জ্বলে ওঠে আর তখন চারপাশের ভণ্ড সমাজের
তোয়াক্কা না করে আপন মনে পারি দেয় কোন দূরদেশে যেখানে পলাশের ছায়ায় সরলতা নেমে আসে
চারপাশে আর ঠিক তখনই কে যেন বলে দেয় আমাদের এখনও অনেক কিছু করার বাকি আছে। তাই
আমরা যারা অস্তিত্বহীনের সমস্যায় ভুগিনা তারা এখনও আপনার মত মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলে
দুঃখ পাই। আপনার পরিবারের প্রতি সহানুভূতিশীল হই। আপাতত এইটুকুই। আপনি যেখানেই
থাকুন শান্তিতে থাকুন এই কামনা করি।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।