আচ্ছা ইন্দ্রজিৎ আপনারা কেউ
চেনেন? সেই যে সেই ছেলেটা, মাথায় ছোট ছোট চুল নীল রঙের জামা পড়ে স্কুলে যায় আর
সাথে আরও দুচারজন থাকে তার। চিনতে পারছেন না বোধহয়? আমিও চিনতাম না, যদি না একদিন
ইউনিভার্সিটি ফেরার পথে তার সাথে দেখা হত। বেশ কিছুদিন হয়ে গেছে তার সাথে আমার দেখা
হয়েছে। এই যে আপনারা যে পুজো কাটিয়ে উঠলেন যার রেশ এখনও আমাদের লোমকূপে লেগে আছে
আমি তার কিছুদিন আগের কথা বলছি। সেদিনও আমি ঠিক সময়েই বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম ভেবেছিলাম
একটা নিরুদ্দেশের ভ্রমণ করে আবার ফিরে আসব। কিন্তু হল না, ভয় পেয়ে গেলাম। আর এই
ভয়ই যখন জমতে শুরু করেছে ঠিক সেই সময়ই লোকাল ট্রেনের জানলার পাশে আমার সাথে
ইন্দ্রজিতের আলাপ। বছর দশকের ইন্দ্রজিৎ। হাতে বেশ কিছু রঙিন বেলুন নিয়ে সে জানলার
ধারে বসে আছে। ওর হাতে বেলুন গুলো দেখে আমার মনে পড়ে যায় সেই যে ছোটবেলায় আমার
বাড়ির পাশে মেলা বসত পুজোর সময় আর আমাদের বাড়িতে এসে থাকত রঞ্জন দা, রঞ্জন দাও ওর
মতন বেলুন ফোলাত। কিন্তু সেগুলো সে বিক্রি করত আর প্রতিদিন বেরোবার আগে আমার হাতে
একটা বেলুন দিয়ে বলত “দাদাবাবু আজ এটা নিয়ে খেলা কর কাল আবার একটা দেব”। আজ মেলাটা
আমার বাড়ির পাশ ছেড়ে দুরে চলে গেছে, আমরাও বাড়ি বদল করে নিয়েছি। শুনেছি ওখানেও
নাকি আজকাল অনেক বেলুন পাওয়া যায় জানিনা আজও রঞ্জন দা আসে কিনা আমি তো অনেক বছর
আগে শেষবার মেলায় গিয়েছিলাম। কিন্তু আজ ইন্দ্রজিৎ আমায় রঞ্জন দার কথা মনে করিয়ে
দিয়েছে। সে আমায় একটা নিল রঙের বেলুন উপহার দিয়েছে। ঐ বেলুনটা নাকি সে স্কুলে ভাল
পড়াশুনার জন্য পেয়েছে। আমিও তাকে বলেছি খুব মন দিয়ে পড়াশুনা করতে আর অনেক বড় হতে
তাহলে ওর বাবা মা খুব খুশী হবে। কিন্তু এটা শুনে ইন্দ্রজিৎ অমন মুখ ঘুরিয়ে নিল
কেন? ওহ আচ্ছা তাই।
ইন্দ্রজিতের বাবা মা কেউ নেই। সে
শিয়ালদহে একটা মিশনে থাকে। তার দাদা আছে সে নাকি শিয়ালদহ ষ্টেশনে কাজ করে। অনেকদিন
আগে ওরা ষ্টেশনে থাকত ষ্টেশনে থাকতে থাকতেই নাকি ওর মা চলে যায়, বাবা আরও আগে চলে
গিয়েছিল। সেই থেকে ও মিশনে থাকে। ও অনেক
দূর অবধি পড়তে চায়, কলেজ পর্যন্ত। আর তারপর নাকি অফিসে কাজ করবে। ইন্দ্রজতের কথা
শুনে আমার ভারী আনন্দ হয়, আমি ওকে বলি না কিন্তু ভাবি শিক্ষাই তোমার অন্তরের মনকে
প্রসিদ্ধ করতে পারে, তোমার চেতনার উন্মোচন করতে পারে। ও আমায় বেলুনটা ফুলিয়ে দেয়।
আমিও ওকে কিছু একটা দেওয়ার জন্য পকেট হাতরাই, অনেক হাতরে একটা দু টাকার কয়েন খুঁজে
পাই। দুটো আনারসের লজেন্স কিনে ওকে দি। ও নিজে একটা খায় আর একটা আমায় দেয়।
আমরা প্রায় গন্তব্যের কাছাকাছি
চলে আসি। ও আমায় বলে পুজোর দিন যদি ওদের মিশনে আসি তাহলে ও আমায় ওর সব বন্ধুর সাথে
আলাপ করিয়ে দেবে আর ওদের মিশনের পাশের গলিতে যে পুজোটা হয় সেখানেও নিয়ে যাবে
কিন্তু আমায় নাকি একটা নতুন সুন্দর জামা পড়ে আসতে হবে এই রংচটা জামা পড়ে আসলে হবে
না। আমি ভাবি বাহ ভালই আমার তো একটা নতুন জামা আছেই।
বাড়ি ফিরে আসি। রাতে আমার বান্ধবী
বলে পুজোতে একদিন ওদের সাথে দেখা করে এস, ওদের তো সেরম কেউ নেই। আমি সম্মতি জানাই,
তোমার দেওয়া নতুন জামাটা পড়ে আমি একদিন দেখা করে আসব।
তাকে জানানো হয়নি কিন্তু আপনাদের
বলি আমি যাইনি। এবারের পুজোটা কেমন যেন বালিশের পাশেই কেটে গেল। জানেন তারপর থেকে
ইন্দ্রজিৎ আমি অনেক খুজেছি, ঐ তো ৩.৩০ এর ট্রেনে ওরা ফিরত আমিও কতবার ফিরলাম
কিন্তু দেখা পেলাম না। শিয়ালদাহ তে ওদের মিশনের খোঁজও পেলাম না। কিন্তু সত্যিই কি
আমি খুঁজতে গিয়েছিলাম? নাকি আজও সেই বালিশের পাশে শুয়ে শুয়ে আমি ভেবে নিলাম আমি
তাঁকে খুঁজে বেরাচ্ছি। হয়ত সত্যিই খুঁজে বেরাচ্ছি। কি জানি ঠিক জানি না।
আপনারা যদি ওকে দেখতে পান, সেই যে
সেই ছেলেটা মাথায় ছোট ছোট চুল নীল রঙের জামা পড়ে স্কুলে যায় আর যে স্কুলে পড়া
পারলে বেলুন পায় হ্যাঁ ও, ওকে বলবেন আমার বাবা একটু সুস্থ হলেই আমি ওর সাথে দেখা
করতে যাব ও যেন আমার জন্য অপেক্ষা করে, আমার মা বলেছে ওর জন্য পায়েস করে দেবে।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।