নিরুদ্দেশ আর
অজ্ঞাতবাসের মধ্যে পার্থক্য কীসের? দুটোর ঠিকানাই তো অজানা। তাহলে? কিন্তু সব
ছেড়ে, সবাইকে ছেড়ে সমস্ত কিছুর থেকে যদি হাত পা গুটিয়ে নিরালা নিরিবিলিতে দিন
পনেরো কাটানো যায়। যেখানে কোন খবর পৌছবে না। শুধুই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করার
এক নিরলস প্রয়াস থাকবে। আপেক্ষিকভাবে হিমশীতল পরিবেশে শীতলতার স্পর্শ নেওয়ার থেকে
অনেক গভীরে গিয়ে কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলার কোন চর্চা থাকবে না।
আপাতভাবে আমি
কি বলতে চাইছি তা স্পষ্ট করা দরকার। দিন পনেরো শহর থেকে অনেক দূরে ছিলাম। শহরের,
মানুষের কোন খবর পৌছনোর কোন মাধ্যম আমার কাছে ছিল না। যাওয়ার আগে ফেলে রেখে
গিয়েছিলাম এক মর্মান্তিক মৃত্যুবাহী শব যাত্রার মিছিলকে। ফেলে রেখে গিয়েছিলাম
রাজনীতিকদের আগোচর মন্তব্যকে। লেখার কোন প্রয়াস তখন করিনি। কারন সমবেদনা জ্ঞাপন
করার উদ্দেশ্য আমার ছিল না। আমার মনে হয়নি সমবেদনা দিয়ে মাতৃহীন পুত্রের
মর্মান্তিক মৃত্যুর শোকে বিহ্বল পিতাকে সান্ত্বনা দেওয়া যায়। আমি একটা অন্য পথ
খুঁজছিলাম যে পথে গেলে একটা বিচারবিভাগীয় তদন্তের থেকেও অন্য এক মাত্রায় পৌঁছানো
যাবে যেখানে কাউকে হারানোর ক্ষোভ, শোক থাকবে না, তার মৃত্যু একটা নতুন দিগন্তের
উন্মোচন করবে, যেখানে ঊষার আলোর সাথে সাথে এক নতুন দিনের শুরু হবে। না, আমি মৃত্যু
নিয়ে রাজনীতি করার কথা বলছি না। আমি একটা বিকল্প পথের কথা ভাবছি।
অনেকদিন
অতিক্রান্ত সকলের স্মৃতি থেকে মলিন হয়ে গেছে সে ঘটনা। কি হয়েছিল তা সকলের জানা।
অনেকে নিজেদের মতামত জানিয়েছে, প্রতিবাদ করেছে। সব ঠিক আছে। কিন্তু ফলাফল কি। আমরা
যখন কোন প্রতিবাদ করি তার উদ্দেশ্য তো এটাই থাকে ভবিষ্যতে এমন কোন ঘটনা আর কখনও
ঘটবে না। কিন্তু দেখে এসেছি খুব সাম্প্রতিক কালে যে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বারবার
ঘটেছে। শুধু স্থান, কাল, পাত্র বদলেছে। উদাহরন দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আমাদের সকলের
স্মৃতি এতটাও কমজোর নয় যে আমরা সেসব ভুলে যাব।
তাহলে বিকল্প
পথটা কি? শাস্তি চেয়ে মিছিল, শোকজ্ঞাপন করে নিরবতা পালন এসব তো থাকবেই, কিন্তু এসব
দিয়ে কি কেউ মুক্তির আশ্বাস দিতে পারবে, পারবে বুক চিতিয়ে ঘোষণা করতে যে ভবিষ্যৎ
নিরাপদ। পারলেও সে পারাতে কোন সগর্ব থাকবে না, মনে মনে সকলে মেনে নিতেও পারবে না
যে ভবিষ্যৎ নিরাপদ। তাহলে কি করতে হবে? আমাদের এমন একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে যে
পথে নিরাপদতার ভরসা না থাকলেও একটা আশ্বাসবাণী থাকবে, যে আশ্বাসবাণীতে বিশ্বাস
থাকবে। কিন্তু কাকে বিশ্বাস করব? এরা তো দেশপ্রেমিক নয়, এরা সমাজসেবিক নয়, এটা তো
এদের পেশা, বুক জ্বালানো ভাষণ দিয়ে জনতা উদ্দীপ্ত করে, নিজের দলের হয়ে ভোট সংগ্রহ
করাই তো এদের উদ্দেশ্য। এর জন্য এরা মাসিক বেতন পায়। যদি ভেবে দেখা যায় তাহলে দেখা
যাবে একটা রাজনৈতিক দলও একটা ইন্ডাস্ট্রি, বহু বেতনভোগী লোক সেখানে কাজ করে, সকলের
কাজের ক্ষেত্রও আলাদা। এদের সকলেরই একটাই উদ্দেশ্য থাকে নিজেদের পন্যকে বেচা।
অর্থাৎ নিজেদের দলকে সরকারের আসনে উন্নিত করা। যাতে করে তাদের মাসিক ভাতার পরিমাণ
বাড়ে, ক্ষমতা বাড়ে, নিজেদের জীবনের সার্বিক হালের উন্নয়ন ঘটে। এদের তো উদ্দেশ্য নয়
সমাজের রক্ষা করা সমাজের উন্নয়ন করা, সাধারণ মানুষের জীবনদশার উন্নয়ন করা। সরকারের
আসনে এলে এদের কাজ হয় তখন সমাজের রক্ষা করা, সে রক্ষা করার মধ্যে তফাত একটাই
নিজেদের অবস্থানকে আরও বেশী করে শক্ত করা যাতে যত বেশী সময় এরা সুবিধা ভোগ করতে
পারে। এইসব আর্গুমেন্টে গিয়ে লাভ নেই। প্রয়োজন হল আমাদের নিজেদের অধিকার ভোগ করার।
কিন্তু যখন সেখানে কোন মধ্যস্থ ব্যক্তি বা দল এসে যায় এবং যারা এই অধিকার
হস্তক্ষেপ করতে বাঁধা দেয় তখন তো কোমর বেঁধে পথে নামতেই হবে বন্ধু।
সরাসরি কথায়
আসি, সুদীপ্ত গুপ্তের মৃত্যু দুর্ঘটনা না খুন সে প্রশ্নের উত্তর খোজার সময় নেই।
সময় হল এই মৃত্যুর স্বার্থে লড়াই করার। লড়াই করার প্রয়োজন ভবিষ্যতকে সুরক্ষিত করার
প্রয়োজনে। প্রশ্ন হল আমরা কোথায় দাড়িয়ে আছি, যে প্রদেশের সর্বাধিক ক্ষমতাধীন
ব্যক্তি যখন বলে যে এটা একটা তুচ্ছ ঘটনা। আমি সমবেদনা জানাচ্ছি। তখনই কি সমস্ত
দায়িত্ব মুক্ত হওয়া যায়। তিনি রাজ্য শাসন করেন, তার আশায় প্রজাগণ স্বপ্ন দেখে নতুন
দিনের, সেখানে একপ্রান্তের মানুষ যখন উপোষ করে দিন কাটায়, রোজগারের উপায় নেই
তাদের, সেখানেও তো তিনি তাদের হয়ে সমবেদিত হতে পারেন, পারেন তো তাদের জন্য একটা
উপায় বের করতে। সমলোচক বলবে করেন না কি দেখুন অমুক জায়গার কত উন্নতি হয়েছে উনি
আসার পর, মানতে দ্বিধা নেই হয়েছে। আমার পাড়ারও উন্নতি হয়েছে, নতুন জলের কল বসেছে,
রাস্তা সারাই হয়েছে, আলো বসেছে, কিন্তু পাশের দামোদরের বাবা এখনও ঐ বিছানাটায় শুয়ে
থাকে। জুটমিল বন্ধ হওয়ার পর থেকে শয্যাশায়ী, ছেলে দামোদর রিক্সা চালাতো, বাবার কাজ
যাওয়ার পর পড়াশুনাটা আর করা হয়নি। স্থানীয় কাউন্সিলরের মেয়ে রিক্সা করে স্কুলে
দিয়ে আসত, একদিন কারা যেন রিক্সাতে মেয়েটাকে অশ্লীল ভাবে উত্যক্ত করে, আর শব দোষ
যায় দামোদরের ওপর, ওরা রিক্সাটা ভেঙে ফেলেছে, গাছে বেঁধে দামোদরকে এমন মেরেছে যে
একটা হাত অবশ এখন আর কোন কাজ করতে পারে না, দুই দিদি ছিল, এক দিদির বিয়েতে অনেক
টাকা পণ চায় পাত্রপক্ষ, বিয়ের মণ্ডপে বাবা দিতে পারে না তা, বিয়ে ভেঙে যায়, দিদিটা
গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করে। এখন জানা যায় না ওরা বেঁচে আছে কিভাবে, কি খায়, কি
পরে, পাড়ার লোক ওদের সাথে কথা বলেনা,
দামোদরের বাবার নাকি কি ছোঁয়াচে রোগ আছে যদি ওদেরও হয়ে যায়। না নতুন সরকার আসার
আগে ওদের কোন উন্নতি হয়নি। তবে ওদের পাশের বাপ্পাদের কিন্তু হয়েছে, বাপ্পা
মাধ্যমিকে তিনবারের চেষ্টাতেও যখন পাশ করতে পারেনি, তখন ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াতো
এদিক সেদিক, সুযোগ বুঝে ঠিক পরিবর্তনের সময় দলিয় জার্সি পরে নেয়, এখন ঐ নতুন
বিল্ডিং এ কন্সট্রাক্সনের যে কাজ চলছে তাতে বালি ফেলার কন্ট্রাক্ট পায়। হিসেব করে
দেখা গেছে প্রতি লরি বালি ফেললে অনেক বড় অঙ্কের টাকার মুনাফা হয়। আর প্রতিমাসে বেশ
কয়েক লরি বালি ফেলে। শুনছি নাকি নতুন একটা প্রমোটরি ব্যবসাও শুরু করেছে। অথচ
ছোটবেলায় বাপ্পা আর দামোদর একই স্কুলে পড়ত, ৭ ঘরের নামতা মনে হয় এখন আর বলতেও
পারবে না বাপ্পা, কিন্তু দামোদর পায়, সেদিন দেখলাম একজন মুটেকে কি সব বিক্রি করে
হিসেব করার সময় সাতের ঘরের নামতা টা দিব্যি বলে গেল।
তাহলে বিকল্প
পথটা কি? বিকল্প পথের কথা বলতে গেলে প্রথমেই ভাবতে হবে সকল ক্ষেত্রে তার যথাযথ
যোগ্য প্রার্থিকেই নির্বাচন করতে হবে। আর নির্বাচনের মাপকাঠি অবশ্যই হতে হবে
শিক্ষা। প্রথাগত শিক্ষা নয়, চরিত্র চিন্তনের শিক্ষা। যে শিক্ষা প্রমান করবে সে তার
নিজের বৃত্তের বাইরে গিয়েও সকলের জন্য ভাববে। তাহলে সেই ব্যক্তি পাওয়া যাবে কোথায়?
অবশ্যই আমাদেরই সেই ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে হবে। কেন আমরা একজন আপাদমস্তক
দুশ্চরিত্র বড়লোকি অশিক্ষিত ব্যক্তিকে নিজেদের নেতা হিসেবে বিবেচনা করে নিয়ে আসব।
কেন তারা একের একের পর মৃত্যুকে দুর্ঘটনা বা তুচ্ছ ঘটনা বলে এড়িয়ে যেতে পারবে। এর
জন্যই প্রয়োজন সঠিক ব্যক্তি নির্বাচন।
দ্বিতীয়ত
সমাজের সকল স্তরের সবাইকে সমভাবে বিবেচনা করে তাদের আর্থিকভাবে সঠিক মূল্যায়ন করতে
হবে। কেন একজন কৃষক এত কম টাকা পাবে যে তার বেঁচে থাকাটা দায় হয়ে যাবে আর প্রতিবছর
কয়েক হাজার কৃষকের প্রাণ যাবে। অবশ্যই একজন কৃষক একজন আই.টি ইন্ড্রাস্ট্রির বেঞ্চ
ওয়ার্মার থেকে বেশী পাবে না, যদিও তার পরিশ্রম তার থেকে অনেক বেশী, কিন্তু সে তার
মত শিক্ষিত নয়, তার বাবা কয়েক লক্ষটাকা ঘুষ দিয়ে তাকে বাইরে থেকে ইঞ্জিনিয়ার
বানিয়ে আনেনি। কিন্তু দুজনের মধ্যে আর্থিক পার্থক্য যেন আকাশ পাতাল না হয়। এমন
ভাবে অর্থকে বণ্টন করতে হবে যাতে সবাই তার অধিকারের পুর্ন অর্থ পায়। সর্বপরি সকলকে
সৎ হতে হবে, নিজ কেন্দ্রিক চিন্তাভাবনাকে দূরে সরিয়ে রেখে ভাবতে হবে অন্যের জন্য,
ভাবনা থেকেই করার চিন্তা আসবে।
এরপর যদি
সরকার সমাজ রক্ষার্থে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে, কোন মৃত্যুর
দায়কে সরকার দূরে সরিয়ে রাখতে পারে না। একটা সুদীপ্তর মৃত্যুর জন্য তার পরিবারকে
আর ক্ষতিপূরণ দিয়ে কি হবে, একা বাবা পেনশনের
টাকায় চলে যাবে, উনি অত লোভী নন, পুত্রশোকে গভীর ভাবে কাতর, এই সময় দয়া করে
ওনাকে লোভ দেখাবেন না। দায় নিন, ঘোষণা করুন এই মৃত্যুর দায় আমার, আমি সর্বত ভাবে
এর ক্ষতি পূরণ দেব। ২৫০০০ বেকারের চাকরি হবে। হবে না দিতে হবে, এটাই লড়াই থাকবে।
তাহলে সুদীপ্তর আত্মাও শান্তি পাবে দূর থেকে দেখে, যে সমাজ গড়ার লক্ষ্যে সে
এগোচ্ছিল এ তো তারই প্রতিচ্ছবি। অর্থাৎ সরকার কোন দায় এরাতে পারবে না, তাকে তার
জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে এবং তা প্রতিবারের মত ভাওতা হবে না। লড়াইটা এই মানসিকতা
নিয়ে করতে হবে, যে আমি লড়াই করছি আমার জন্য দুটো সংসার বেঁচে যাবে। এর থেকে বড়
সুখের আর কি হতে পারে।
আর সবশেষে, না
সবশেষে নয়, কারন ওপরের গুলো পুর্ণ করার জন্য এখনই প্রয়োজন সমস্ত দলমত নির্বিশেষে
সবাই এক হয়ে সুস্থ সমাজ গড়ার লক্ষ্যে, সকলের সমান অধিকারের লক্ষ্যে, নিজের
আত্মসম্মানের দায়ে এখনই প্রয়োজন পথে নামার। সর্বত ভাবে একটা বৈপ্লবিক পরিবেশ
সৃষ্টি করা, যাতে আগামিকাল নিরাপদ হয়। যদি সিরিয়া পারে, লিবিয়া পারে, মিশর পারে,
তিউনিসিয়া পারে, আর আমাদের পাশের বাংলাদেশের নবীন প্রজন্ম পারে তাদের লড়াইকে এগিয়ে
নিয়ে যেতে তাহলে আমরা ত্বত্ত না চটকিয়ে এই দুরাবস্থায় পথে নেমে লড়াই করতে পারব না
কেন বৃহত্তর স্বার্থের জন্য।
আহ্বান রইল
সকলের জন্য, একটু ভেবে দেখুন, সময় যে বয়ে যায়।।
আদি লিখতে থাক। ক্রমাগত। একটুও না থেমে। শুভেচ্ছা। :)
উত্তরমুছুনধন্যবাদ অশেষ।
উত্তরমুছুন