আজ সর্বতভাবে স্বীকার করতে ক্ষতি নেই যে, পশ্চিমবঙ্গ ভারতের মধ্যে একটি দুর্বল রাজ্য। তার দুর্বল তার অধিবাসীরা। তবে সর্বাপেক্ষা দুর্বল এখানকার রাজনীতিকরা, তদুপরি মাননীয় মন্ত্রীরা। যারা সবসময় তাদের সেপাই সান্ত্রীদের পিছনে থেকে আশ্বাস বাণী দেন, আর আমরা তা দুচোখ বুজে হাসি মুখে মেনেনি। জলজ্যান্ত সাতখানা প্রাণ যেতে পারত কিন্তু তাতে কার ভ্রুক্ষেপ নেই, সগর্বে বলে ওঠা যায় “ সব পরিকাঠামো ঠিকই ছিল দু-চারটে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া আর কিছুই তেমন ভাবে হয়নি। সব কিছুই সুস্থ ভাবে সম্পন্ন হয়েছে”।
১ ঘন্টার পরীক্ষার জন্য মানুষ ৪ ঘণ্টা পরিশ্রম করে অক্লান্ত জার্নি করে পরীক্ষাকেন্দ্রে উপস্থিত হয়েছে, তারপর জেনেছে যে তার পরীক্ষার সিট তো অন্য জায়গায় পড়েছে। দু-তিন খানা ট্রেন বদল করে, দমবন্ধকর পরিস্থিতির মধ্যে প্রায় ৩২ ডিগ্রি গরমে হাঁসফাঁস করতে করতে প্রায় শুকিয়ে যাওয়া শরীর নিয়ে বাসের ছাদে, লরির দেওয়ালে, ট্রেকারের রদ ধরে ঝুলতে ঝুলতে যখন পরিক্ষাস্থলে উপস্থিত তখন তো প্রায় পরীক্ষা শেষ, তবুও ১৫ মিনিট তো বসতে হল, কিন্তু যারা তার পরে এলেন তারা তো পরে পুরো পরীক্ষা দিলেন, তারবেলা? পরিক্ষাকেন্দ্রে বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই, পানীয় জলের ব্যবস্থা নেই, তবুও প্রায় ৬০ লক্ষ মানুষ ছুটির রবিবার প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন বাসে ঝুলতে ঝুলতে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল, কেন গিয়েছিল? কেন গিয়েছিল ২৬ বছরের গৃহবধূ? কেন গিয়েছিল এয়ারকন্ডিসন কোম্পানির কর্মচারী? কেন গিয়েছিল ৩ বছরের অনির্বেদের মা, বাবা? কেন গিয়েছিল কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার? কেন গিয়েছিল যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার ডিগ্রীর ছাত্র? কেন গিয়েছিল আরও কয়েক লক্ষ মানুষ যারা কেউ চাকুরিরত, কেউ গৃহবধূ, কেউ ছাত্র বা ছাত্রী? কেউ বা নিপাট বেকার।
কি ছিল এই পরীক্ষায় যার জন্য রাতদিন এক করে মানুষ প্রস্তুতি নিয়েছে, কেউ বা সখ করেই গেছে দিতে, সামান্য একটা তো প্রাইমারী স্কুল টিচার নেওয়ার পরীক্ষা মাস গেলে মাইনে ১২,০০০ কিছু বেশী, সামান্য কন্সট্রাকসন কারখানার লেবাররাও এর কাছাকাছিই পায় মাস গেলে। তবুও কি এমন ছিল এতে? হ্যাঁ ছিল, সরকারের ষ্ট্যাম্প ছিল, যা কোনদিনও কেউ কেরে নিতে পারবে না। ভরসা ছিল, আশ্বাস ছিল। তার বরেই মানুষ দুরদুরান্ত থেকে সমস্ত বাঁধা অতিক্রম করে এসেছিল। আবার ফিরেও গেল, ফিরল না অনেকগুলো মানুষ যারা আজ হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে। তারাও তো স্বপ্ন দেখেছিল একটা চাকরির, মনে মনে হয়ত আমার মত আশায় বুকও বেঁধেছিল। কিন্তু ঘরে ফেরা তাদের হল না।
পরিকাঠামোগত এত ত্রুটি কেন? যানবাহনের এত সমস্যা কেন? সমস্যা অন্য জায়গায়, সমস্যা হল বুদ্ধি দিয়ে বিবেচনা দিয়ে সব কিছু বিচার করে তবে তার অভিসন্ধি বের করা। এক প্রান্তের মানুষ কে যখন অন্য প্রান্তে পাঠানো হচ্ছে তখন তার সুবন্দোবস্ত থাকা প্রয়োজন, যানবাহনের পর্যাপ্ততা থাকা প্রয়োজন। কিন্তু তার কোন ব্যবস্থা ছিল না। অথচ বুক ফুলিয়ে বলা হয়, সমস্ত কিছুর সুবন্দোবস্ত ছিল। অথচ যারা হাড়ভাঙা খাটুনি করে গিয়ে আবার ফিরে এসেছে তাদের যদি এ প্রশ্ন করা হয় যে, পরিকাঠামো কেমন ছিল? আমি নিজেই নিজের দায় নিয়ে বলতে পারি যে ৯০ শতাংশ মানুষ ভালোর বিপক্ষে বলবে।
যদি প্রশ্ন করা হয় কেন এমন হল? পুরোটাই কি অভিসন্ধির অভাব? একটু ভালো করে বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে এর মধ্যেও রাজনীতির ভূত লুকিয়ে আছে। সামনে পঞ্চায়েত ভোট, এই দুবছরে সরকার যা তার কাজের নমুনা দেখিয়েছে, তাতে করে মানুষ যে আশায় ৩৪ বছরের রাজ্যপাটের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে নতুন সরকারকে নিয়ে এসেছে, তাতে করে শুধু আশ্বাস, শিলান্যাস ছাড়া আর তেমন কিছুই চোখে পড়েনি। শুধু মাঝে মাঝে সরকারি ভাষায় এমন দু চারটে বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া। কিন্তু এই বিচ্ছিন্নতার সংখ্যা যে কত তার হিসেব হয় নি। তাই একটা ব্রেন ওয়াসের সুযোগ তো করতেই হবে যাতে করে বাংলার মানুষ আবার প্রতিবারের মত সব কিছু ভুলে যেতে পারে। এর চেয়ে বড় সুযোগ বোধহয় আর কিছু ছিল না। ৩৫০০০ হাজার চাকরির লোভ অনেক বড়। সুলভে বিরিয়ানির চেয়েও মানুষ আগে গিলবে।
কিন্তু এই খেলা খেলবার আগে একটু নেট প্র্যাকটিসের প্রয়োজন ছিল। বিপক্ষের রণনীতি দেখবার দরকার ছিল। এই জন্যেই প্রয়োজন হয় শিক্ষাগত বিদ্যার, তদুপরি বুদ্ধি প্রয়োগ করার ক্ষমতার। বিপক্ষও কিন্তু এই একই নীতি প্রয়োগ করেছিল কিন্তু সেখানে বুদ্ধিমত্তার ছাপ ছিল। একসাথে সমগ্র রাজ্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়নি। আলাদা আলাদা ভাবে বিভিন্ন জেলার পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে তাও একদিনে নয় এক এক জেলায় দু-তিন দফায়ও পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। যদিও তার ফলাফল বেরিয়েছিল কিনা আমার মত অজস্র পরীক্ষার্থি আজও জানে না। যেমন আজও কারও কারও হতাশা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌছেছে যে, এই পরীক্ষার ফলাফলও এত বাঁধা এত বিঘ্ন ঘটার পর আদৌ বেরোবে তো? কেননা মেয়াদ ফুঁড়োতে বড়জোর আর ২-৩ বছর তার আগে থেকেই বিসর্জনের গান শুরু হয়ে যাবে। তখন? তাই বলতে দ্বিধা নেই, সেই ট্র্যাডিশন এখনও চলতে শুধু শীর্ষে থাকা মানুষ গুলোর মুখ পরিবর্তন হয়েছে, রঙ পরিবর্তন হয়েছে, মানসিকতার কোন পরিবর্তন হয়নি। তাই মানুষের হয়রানির সীমা কোনদিনও হ্রাস পাবে না, জীবনযাপনের মানের উন্নতি হওয়াও বড়ই জটিল চিন্তাভাবনা, সবাই শুধু সমস্যার উৎক্ষাপন করতেই ব্যস্ত, সমাধানের কোন ইস্যু তাদের কাছে নেই। ক্ষমতা লাভের এ চিরন্তন লড়াই চলছে, চলবে, আমার আপনার কথা, সমাজের সার্বিক উন্নতির কথা কেউ ভাববে না। অন্য কোন জানলাও খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে অন্য স্বরে কেউ কথা বলবে। মুক্তির আশ্বাস দেবে। সামাজিক রীতিনীতি অনেক তো চটকালাম, বিয়ে প্রেম, পরকীয়া, সমকামী এসব তো হয়েছে আর হবেও কিন্তু জীবনযাপনের জন্য যে স্বল্প উপাদানের প্রয়োজন, তা কিভাবে হাসিল করা যাবে, তা নিয়ে কে বলবে?
একটা সমাজ তখনই বদলায় যখন কেউ ভয়ভীতি, দায়ভার, পিছুটান এসবকে দূরে রেখে মানুষের হয়ে লড়াই করবার জন্য তাদের সমস্ত প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধার কথা বলবার জন্য এগিয়ে আসে। যেমন কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে কৃষ্ণের আবির্ভাব হয়েছিল, গেরিলা যুদ্ধে চে, স্বাধীনতার আন্দোলনে নেতাজি সুভাষ প্রমুখ। কিন্তু তাদের সাথে মানুষেরও সহযোগিতা ছিল, আপামোর মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের ডাকে সারা দিয়ে। আজ যেমন প্রজন্ম চত্বর, শহীদ রুমি স্কোয়ার নতুন প্রজন্মের রক্তে টগবগ করে ফুটছে, অহিংস আন্দোলন করছে শত্রুর চূড়ান্ত বিচারের জন্য, এক নির্ভিক ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্রের জন্য, তারও সূচনা হয়েছিল একটা ছোট পদক্ষেপ দিয়েই। শাহবাগ এর মিছিলের মাধ্যমে। কিন্তু চিন্তার পরিস্ফুটন ঘটেছিল বহু আগেই, নিজেদের মধ্যে নিজেদের স্বাধীন মত প্রকাশের মাধ্যমে। ব্লগ লিখনের মাধ্যমে।
যদি আমাদেরও নিজেদের অধিকার, পাওনা সব পেতে হয়, তবে এই মুহুর্তেই একটা বিপ্লবের সূচনা করার প্রয়োজন আছে, অন্তত আচলের তলায় মুখ না লুকিয়ে নিজের স্বাধীন অভিমত প্রকাশ করতেই হবে। নতুন সমাজ গরতে হলে, নতুন প্রজন্মকে একটা চূড়ান্ত পরীক্ষা তো দিতেই হবে। না হলে এই অবস্থার কোন পরিবর্তন হবে না। ইতিহাস গরতে হলে একটু ইতিহাস জানা দরকার। সর্বপরি চিন্তার বিকাশ ঘটানো দরকার। ভাবুন, এটাই ভাববার সময়। তবে সময় খুবই অল্প। তাড়াতাড়ি করুন। অপেক্ষায় রইলাম আমি নিজেও কবে সামিল হতে পারব। যুদ্ধ গরতে না পারলেও সৈন্য হিসাবে যোগ দিতে প্রস্তুত আছি। থাকব।।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।