রোম্যান্টিক মিউজিক্যাল কমেডি, স্যাটায়ার মূলক সাইকোলজিক্যাল কমেডি, রোম্যান্টিক ফ্যান্টাসি এবং সবশেষে সাইকোলজিক্যাল সাসপেন্স থ্রিলার। “ঝংকার বিটস”,“হোমডেলিভারি”, “আলাদিন” এবং অতঃপর “কাহানী”। “পা”, “নো ওয়ান কিলড্ জেসিকা”, “দ্যা ডারটি পিকচার” এবং সবশেষে “কাহানী”। “পা” ছবি থেকে শুরু করে অভিনেত্রী বিদ্যা বালান একের পর এক অনবদ্য সৃষ্টি যে করে চলেছেন “কাহানী” তার নবতম সংযোজন। আর পরিচালক সুজয় ঘোষ বেশ কয়েকটি ফ্লপ ছবির পর এবার এক অসাধারন ছবির সার্থক রূপকার।
“কাহানী” এই নামের মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা গল্প কিন্তু কি সেই গল্প? শুধুই কি চিত্রনাট্যে রচিত গল্প? না, এক্ষেত্রে পরিচালক একাধারে যেমন চিত্রনাট্যে রচিত গল্প কে পরিবেশন করেছেন তেমনি পরিবেশন করেছেন আরও কিছু নিঃসচুপ কাহানী। বলা জেতে পারে “কাহানী” যেমন বিদ্যা বাগচির কাহিনী, তেমনি এটা তিলত্তমা কলকাতারো কাহিনি। যুবা, কলকাতা মেল ইত্যাদি ছবিতে কলকাতা প্রেক্ষাপট হলেও আপামর ভারতবাসীর কাছে কলকাতাকে এইভাবে পরিবেশন করা আগে হয়নি এটা দাবি করে বলা যায়। মোণালীশা লজ, কালীঘাট পুলিশ ষ্টেশন, ন্যাশান্যাল ডাটা সেন্টার, হাওড়া ব্রিজ, রৌদ্রস্নাত বাঙালীর ঘর্মাক্ত দুপুর, কূয়াশা মাখা ভোর, মায়ের আগমন, বিসর্জন- এইভাবে আগে মেলে ধরা হয়নি। তাই নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে কলকাতা “কাহানীর” একটা চরিত্র। এ ছবি তাই কলকাতার ও কাহিনী। শুধুমাত্র কলকাতাতেই ছবি আটকে “কাহানী” ধীরে ধীরে আবার তা সমগ্র বাঙালী জাতির সংস্কৃতির ও কাহানী ও হয়ে ঊঠেছে। এক্ষেত্রে পরিচালকের গল্প বলার ভঙ্গিমাটা, গল্পের পরিকাঠামো গঠনের বুননটাই ছবিটাকে সমৃদ্ধ করে তুলেছে।
লন্ডন প্রবাসী বিদ্যা বালান রূপী বিদ্যা বাগচী তার স্বামী অনব বাগচী কে খুঁজতে কলকাতায় আসে যে কিনা কাজের সূত্রে কলকাতায় এসে হারিয়ে যায়। তাঁকে খুঁজতে তার ৭ মাসের অন্তঃষত্বা স্ত্রী কলকাতায় আসে। সরাসরি এয়ারপোটে নেমেই কালীঘাট থানায় F.I.R লেখাতে গিয়ে আলাপ হয় সাত্যকী ওড়ফে রাণা ওরফে পরমব্রতের সাথে। যে কিনা আগামী দিনে বিদ্যার চালিত রথের চালকও ছিল। NDC তে কর্মরত বিদ্যার স্বামী হদিস কোনোভাবেই কলকাতার কোথাও পাওয়া যায় না। কিন্তু ঘটনাচক্রে বিদ্যার স্বামীর সাথে বহু পুরাতন NDC এর এক কমচারীর মিল পাওয়া যায়। ঘটনা এগিয়ে যায় ক্রমে জানা যায় সেই কর্মী কলকাতায় ২ বছর আগে ঘটে যাওয়া মেট্রোরেলে আততায়ী হামলার পরই পলাতক। ইন্টারন্যাশান্যাল ব্যুরোও তার কোনো খবর জোগাড় করতে পারে না সমস্ত তথ্যই গায়েব হয়ে যায়।
এরপর বিদ্যা আদও তার স্বামী কে খুঁজে পায় নাকি সেই পলাতক কর্মীই তার স্বামী নাকি অন্য কিছু ঘটনা আবিষ্কার হয়, নাকি অন্য কোনো তথ্য উন্মোচন হয় তা দর্শক ছবিটি দেখার পরই আবিষ্কার করবে, সে প্রসঙ্গ এ লেখার অংশ নয়। লিখলে একটা ভালো ছবি দেখার আগ্রহটাই দর্শকদের চলে যাবে।
বিদ্যা বালান এক কথায় অনবদ্য আবার একটা ন্যাশান্যাল অ্যাওয়াড উইনিঙ্গ পারফরমেন্স। “ভাল থেকোর” পর পরমব্রত এর সাথে বিদ্যা বালানের আবার পুরানো রসায়নটা সেভাবে না ফুটিয়েও পরিচালক এক অনবদ্য ভাবে শুধুমাত্র ভাব প্রকাশের মাধ্যমে বর্ণনা করেছেন যা সত্যিই নজর কারার মত। আর এক জনের কথা না বললেই নয় সে হল শাশ্বত চ্যাটার্জী যার আবির্ভাবটাই যেন ছবিটার মধ্যে একটা সাইকোলজিক্যাল সাসপেন্স তেরি করেছে। তার চাহনিতেই যেন এক রহস্য লুকীয়ে আছে। আর এখানেই একজণ সফল পরিচালকের সার্থকতা, অনেক না বলা কথা শুধুমাত্র চরিত্রের অঙ্গভঙ্গি বা চাহনির মাধ্যমেই প্রকাশ পায় তার জন্য ভাষার প্রয়োজন হয় না।
অন্যান্য চরিত্রে খরাজ মুখোপাধ্যায়, শান্তিলাল মুখোপাধ্যায়, কল্যাণ মুখোপাধ্যায়, আবীর চট্টোপাধ্যায়, ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়, হোটেলের ম্যানেজারের ছোট চরিত্রে নিত্য গাঙ্গুলি, হট রানিং ওয়াটার এর চরিত্রে শান্তিলাল মুখোপাধ্যায় এর ছেলে ঋতব্রত ও চায়ের দোকানের ছেলে পল্টূ চরিত্রে কৌশিক সেনের ছেলে ঋদ্ধি প্রত্যেকেই দারুণ। বিশেষভাবে নজর পড়ে IB এর কমান্ড খান এর ভূমিকায় নিজামূড্ডীন সিড্ডীকী। তবে ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায় এর চরিত্রটা আর একটু বেশী হলে হয়ত ভালো হত।
অ্যাডভাইটা করের কাহিনী, সূজয় ঘোষের চিত্রনাট্য ছবিটাকে এক অন্য মাত্রায় নিয়ে গেছে, একটা ভালো গল্পই যে একটা ভালো ছবি হবে তা সবসময় হয় না, ঠিক কীভাবে গল্পটাকে পরিবেশিত করা হল তাও একটা ভালো ছবির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এক্ষেত্রে পরিচালক সেই কাজটাই খূব বুদ্ধিমত্তার সাথে করেছেন, রহস্যের গীট গুলোকে তিনি যেমন বেধেছেন ঠিক সেই ভাবেই ছবির শেষে তিনি খূব সাবধানতা অবলম্বন করে একের পর এক গীট খুলেছেন অল্প তাড়াহুড়ো হয়ত করেছেন কিন্তু ছবির শেষে তিনি একটা দৃশ্যহীন পরিষ্কার গীটহীন সাদা সুতোয় সমগ্র ছবিটাকে বেঁধে আমাদের উপহার দিয়েছেন।
নজড়কাড়ে সেতুর সিনেমাটোগ্রাফি ও নম্রতা রাওয়ের সম্পাদনা। মনে হয় সেতুর চোখ দিয়েই আমরা আমাদের চেনা কলকাতাকে নতুন ভাবে দেখলাম। ছবির শেষের দিকে যেভাবে ক্যামেরার জার্ক মুভমেন্ট ঘটিয়ে এক্সপেরিমেণ্ট করা হয়েছে তাও নজর কারে। নম্রতা রাওয়ের সম্পাদনা বিশেষত ছবির শেষের দিকে দুর্গাপূজোড় সিকোয়েন্সে সমান্তরালই চলা দুটো ঘটনাকে যেভাবে সম্পাদনা করে পরিবেশিত করা হয়েছে তা আলাদা ভাবে প্রশংসার যোগ্য।
ছবির সংগীত নিয়ে আলাদা ভাবে বলতেই হবে কেননা কোনও কোনও দৃশ্যে আবহসঙ্গীতটাই সেই দৃশ্যের ন্যাড়েটাড়। সাসপেন্সের দৃশ্যে থ্রিলিং মিউজিক ব্যবহার না করে শহরের নিজস্বতা বজায় রাখার জন্য যেভাবে শহরের সাউণ্ডস্কেপ ব্যবহার করা হয়েছে তা এককথায় অনবদ্য, দর্শক মনে তা আলাদা জোয়ার আনে। তাই সংগীত পরিচালক বিশাল-শেখর আলাদাভাবে প্রশংসার দাবিদার। শুধুমাত্র অমিতাভ বচনের কণ্ঠে “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে রে তবে একলা চলো রে” গানটা প্রশ্নচিহ্নের মধ্যে আসতে পারে। শুধুমাত্র বাঞালীয়াণাকে দেখানোর জন্য বা কলকাতা ছবির প্রেক্ষাপট বলেই এই গানটা ব্যবহার করা হয়েছে নাকি ছবির গল্পের সাথেই ব্যবহারযোগ্য বলে ব্যবহার করা হয়েছে, তা পরিষ্কার নয়। গানটা ব্যবহার না করলেও হয়ত কোনও অসুবিধা হত না কিন্তু বাঙালী মনটাকে হয়ত ছোঁয়া যেত না।
পরিশেষে বলতে হয় আপামর বাঙালী সংস্কৃতি তাদের জীবনধারণ এর পরিকাঠামো তাদের রোজনামচা ও ঐতিহ্য যেভাবে পরিচালক সূজয় ঘোষ ছবিতে তুলে ধরেছেন তা “কাহানী”-র আর এক কাহিনী।।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
ধন্যবাদ অসংখ্য।